৩০ গ্রাম বিলীনের আশঙ্কা

বিষখালী নদীর তাণ্ডবে পাল্টে যাচ্ছে বামনার মানচিত্র

ইকবাল কোরাইশী, বামনা (বরগুনা)

বিষখালী নদীর তাণ্ডবে পাল্টে যাচ্ছে বামনার মানচিত্র
ছবি: আমার দেশ

বরগুনার উপকূলীয় উপজেলা বামনায় বিষখালী নদীর অব্যাহত ও ভয়াবহ ভাঙনে বদলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে উপজেলার মানচিত্র। নদীর প্রবল স্রোত ও করাল গ্রাসে তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামের হাজার হাজার পরিবার হারিয়ে ফেলছে তাদের শেষ সম্বল।

তীব্র ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের। ইতিমধ্যে ভিটেমাটি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হারিয়ে অনেক পরিবার একবারে নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিষখালী নদীতে অতি সম্প্রতি স্রোত অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার চেঁচাঁন, বেবাজিয়াখালী, অযোধ্যা, রামনা লঞ্চঘাট, দক্ষিণ রামনা এবং কলাগাছিয়া খাদ্যগুদাম সংলগ্ন আবাসন এলাকাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে মারাত্মক ভাঙন দেখা দিয়েছে।

এতে খাদ্যগুদাম সংলগ্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পের আবাসন এবং দক্ষিণ রামনা-ফুলঝুড়ি সড়কের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইতিমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। দ্রুত টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বরগুনা জেলা সদরের সঙ্গে বামনা উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পাশাপাশি নদীর পানিতে তলিয়ে যেতে পারে আশপাশের অন্তত ৩০ গ্রাম।

দক্ষিণ রামনার স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন শরীফ জানান, রামনা লঞ্চঘাট ও দক্ষিণ রামনা এলাকাটি শুধু খেয়া পারাপারের স্থান ছিল না, এটি ছিল এই অঞ্চলের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এক বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে পণ্যবাহী ট্রলার ও লঞ্চ ভিড়ত এবং কৃষিপণ্য ও মাছ বেচাকেনায় হাজার মানুষের সমাগম ঘটত। কিন্তু নদীর অব্যাহত ভাঙনে আজ সেই সমৃদ্ধ অতীত বিলীন হওয়ার পথে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সালাউদ্দিন হাওলাদার ও আবুল কালাম আজাদ রানা বলেন, দীর্ঘ চার দশক ধরে এলাকাটি ভাঙনের শিকার। এলাকার একমাত্র খাদ্যগুদাম, সংযোগ সড়ক এবং প্রায় ৭-৮ কিলোমিটার কৃষিজমি ও বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে চলে গেছে।

প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ মানুষ এই সড়ক দিয়ে জেলা সদরে যাতায়াত করেন। নতুন সরকারের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তারা প্রাচীন এই জনপদ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানান।

ভাঙনের তীব্রতার বিষয়টি নিশ্চিত করে বামনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিকাত আরা জানান, বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পুনরায় বেশ কিছু এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিবারগুলো চরম ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে একাধিকবার কথা হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পুনরায় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অবহিত করা হবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, ‘আমরা ইতিমধ্যেই চেচাঁন ও বামনা লঞ্চঘাট এলাকায় ব্লক ও ডাম্পিংয়ের কাজ শেষ করেছি। বর্তমানে দক্ষিণ রামনা এলাকায় জিও ব্যাগ দিয়ে ডাম্পিং চালানো হচ্ছে। বর্ষা ও বন্যার কথা বিবেচনা করে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কাজের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে স্থায়ী ব্লক নির্মাণের বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন, যা কিছুটা সময়সাপেক্ষ।’

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভাঙনকবলিত বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর স্থায়ী পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলে কৃত্রিম সান্ত্বনা দেওয়া হয়, যা নদীর প্রচণ্ড স্রোতে কিছুদিন পরেই ভেসে যায়।

ভিটেমাটি রক্ষা ও স্থায়ী অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়াতে বিষখালী নদীর তীরে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই গাইড বাঁধ ও সিসি ব্লক নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন