মেঘনায় ইজারা ছাড়াই বালু লুটের মহাযজ্ঞ

মেঘনায় ইজারা ছাড়াই বালু লুটের মহাযজ্ঞ
মেঘনার বুকে সারি সারি সারি ড্রেজার মেশিন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মেঘনা নদীর তলদেশ থেকে ইজারা ছাড়াই চলছে বালু উত্তোলনের মহাযজ্ঞ। অভিযোগ, ভৈরব ও আশুগঞ্জের একটি প্রভাবশালী চক্র প্রতিদিন অর্ধশতাধিক ড্রেজারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলন করছে। এতে নদীভাঙনের মুখে পড়েছে চর সোনারামপুর গ্রাম। একই সঙ্গে আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জাতীয় গ্রিড লাইনের টাওয়ার, তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, দুটি রেলসেতু ও একটি সড়ক সেতুর নিরাপত্তা নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা যায়, কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার মেঘনা নদীর টুক চাঁনপুর, মেন্দিপুর ও লইন্দা মৌজার বালুমহাল ইজারা নেওয়া হলেও ইজারাদারেরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ অংশে প্রবেশ করে বালু উত্তোলন করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, আশুগঞ্জের প্রভাবশালী একটি মহলকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চর সোনারামপুর, সোহাগপুর ও আশুগঞ্জ বন্দরসংলগ্ন এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করছে একটি সিন্ডিকেট।

চর সোনারামপুর গ্রামের বাসিন্দা রানা সরকার বলেন, আমরা এখন অসহায়। প্রভাবশালীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি। প্রশাসন যদি আমাদের নিয়ে ভাবত, তাহলে দিনরাত এভাবে বালু তুলে আমাদের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে ফেলতে পারত না।

একই গ্রামের রাণী দাস বলেন, আমাদের দুটি ঘর ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনে চর আগের তুলনায় অর্ধেক হয়ে গেছে। এভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে চর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।

আশুগঞ্জ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জহিরুল ইসলাম জারু মিয়া বলেন, কিশোরগঞ্জের ডিসি কীভাবে ওই জলমহাল মাটি কাটার জন্য ইজারা দিলেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়। তারা ইজারা নিয়েছে মেন্দিপুর ও টুক চাঁনপুর এলাকায়, অথচ বালু তুলছে চর সোনারামপুর থেকে। কয়েক দিন আগে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।

আশুগঞ্জের সদ্য বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাফে মোহাম্মদ ছড়া বলেন, ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর অভিযান চালিয়ে ১০টি ড্রেজার জব্দ করা হয়েছিল। সে সময় আমাদের ওপর হামলা চালিয়ে একটি ড্রেজার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং চার্জশিটও দাখিল করা হয়েছে। এর পরও নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছি। তবে আমরা অভিযান চালাতে গেলে তারা আশুগঞ্জের সীমানা ছেড়ে ভৈরব অংশে চলে যায়। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।

প্রশাসনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আশুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই—এ বিষয়ে শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারি। তবে অন্য কেউ জড়িত থাকলে সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, তারা কিশোরগঞ্জ থেকে ইজারা পেয়েছে, যা আশুগঞ্জ সীমানা থেকে তিন-চার কিলোমিটার দূরে। এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা যৌথ অভিযানের জন্য কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছি। যাতে অভিযানের সময় অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা সীমান্ত পার হয়ে পালিয়ে যেতে না পারে। আইন সবার ঊর্ধ্বে। শিগগিরই যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য খালেদ হোসেন মাহাবুব শ্যামল বলেন, চর সোনারামপুরে অবৈধ বালু উত্তোলন এলাকাবাসীর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে একটি বালু সিন্ডিকেট রয়েছে, যার সঙ্গে প্রশাসনের কিছু লোকও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা কিশোরগঞ্জ এলাকায় ইজারা নিয়ে আশুগঞ্জে বালু তুলছে। এতে চর সোনারামপুর ধ্বংসের মুখে পড়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি, যারা এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত।

জেডএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন