ঘুসের বিনিময়ে চার্জশিট থেকে নাম বাদ দিয়ে মাদক মামলার আসামিকে বিদেশে পালানোর সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডিএনসির রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ও এলাকার লোকজন মঙ্গলবার বিভাগীয় কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজিসহ সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এতে বলা হয়, রংপুরের মিঠাপুকুরের মাদক সম্রাট মোরছালিন মিয়ার (৩২) কাছ থেকে মোটা অংকের ঘুস নিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক দিলারা রহমান এবং উপপরিদর্শক মেহেদুল ইসলাম সরদার। এরপর মাদক মামলার চার্জশিটে ভুল কলামে তার নাম দিয়ে পুলিশের পিসিপিআরে আসামিকে অব্যাহতি দেখিয়ে বিদেশ পালাতে সহযোগিতা করেছেন।
মাদক সম্রাট মোরছালিন মিঠাপুকুরের বালুচর কাশিনাথপুর এলাকার হাতিমপুর গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে। মাদক কারবার করে এলাকায় সুবিশাল বাড়ি এবং কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তির পাশাপাশি ঢাকায়ও কয়েকটি ফ্ল্যাট কিনেছেন।
অভিযোগকারী মুশফিকুর আমার দেশকে বলেন, মাদক কারবার করে পুরো এলাকা নষ্ট করে দিচ্ছে মোরছালিন। ৯ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মিঠাপুকুর থানায় মাদক মামলা হয়। এ মামলার তদন্ত ও চার্জশিট নিয়ে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে গুরুতর কিছু অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, মামলার চার্জশিটে মোরছালিনের নাম আসামিদের জন্য নির্ধারিত কলামের পরিবর্তে অব্যাহতির জন্য ব্যবহৃত কলামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশের পিসিপিআরেও তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে চার্জশিটে তার জীবিত পিতা আব্দুল লতিফকে মৃত দেখানোর বিষয়টিও প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
জানা গেছে, মোরছালিন গত ২১ আগস্ট ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব গেছেন। অথচ ইয়াবা উদ্ধার মামলায় ৬ সেপ্টেম্বর তার আদালতে হাজিরার তারিখ ছিল। কিন্তু তিনি আদালতে উপস্থিত হননি। আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে জানা যায়, তিনি মক্কায় ওমরাহ পালনের জন্য গেছেন উল্লেখ করে সময় প্রার্থনা করা হয়েছে।
বিষয়টি পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয়, তিনি আদালতের কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় বিদেশে অবস্থান করছেন। তিনি কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, আদালতকে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না এবং তার বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি রাখে। কারণ মাদক কারবারি মোরছালিন এত বেশি অর্থের মালিক যে, গত ৯ আগস্ট স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও ছোট বোন মনোশি বেগমের নামে অর্ধ কোটি টাকা টাকা মূল্যের জমি কিনেছেন (দলিল নম্বর ৮৫১২)। এছাড়া মিঠাপুকুর উপজেলার বাজারে এলাকায় প্রায় অর্ধকোটি টাকা মূল্যের আরো কিছু জমি বায়নাপত্র করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৮ জুলাই ডিএনসির রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের পরিদর্শক মোজাফফর হোসেন শাহের নেতৃত্বে মিঠাপুকুরের রাণীপুকুর জুমা খানপাড়া এলাকার মো. খালেদ খানের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৯ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে। এ সময় খালেদ খানের স্ত্রী নাজমা বেগমকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে নাজমার স্বামী খালেদ খান এবং মাদক সম্রাট মোরছালিন পালিয়ে যায়। এ বিষয়ে ডিএনসি রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে মিঠাপুকুর থানায় এজাহার দায়ের করেন।
আদালতে দাখিল করা চার্জশিট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চার্জশিটের তিন নম্বর কলামে তদন্তে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের নামের জায়গায় অভিযুক্ত খালেদ ও মোরছালিনের নাম না দিয়ে ২ নম্বর কলামে চার্জশিট থেকে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়ার কলামে নাম দেওয়া হয়। এজাহারে মোরছালিন কক্সবাজার থেকে ৯ হাজার ইয়াবা এনে খালেদের বাড়িতে মজুত করেছেন উল্লেখ থাকলেও আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে মোরছালিনকে মাদক বিক্রিতে সহযোগিতা করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে মোরছালিনের জীবিত পিতা আব্দুল লতিফকে চার্জশিটে মৃত দেখানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মেহেদুল ও ডিএনসির রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক দিলারার যোগসাজশে মামলার চার্জশিটে মোরছালিনকে অপেক্ষাকৃত হালকা অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে কৌশলে পুলিশের পিসিপিআরে মাদক মামলায় অব্যাহতি দেখিয়ে বিদেশ পালানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়।
গোপন সূত্রে জানা যায়, গত ২১ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১২টায় সানজিলা মুনতাসির ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুর লিমিটেডের সহযোগিতায় ইউএস বাংলার ফ্লাইটে ওমরাহ ভিসায় সৌদিআরব গেছেন মাদক সম্রাট মোরছালিন। ওমরাহ শেষে একই টিকিটে ১৯ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার কথা রয়েছে এই মাদক কারবারির। তবে সৌদি আরবে পৌঁছেই স্থায়ীভাবে সেখানে অবস্থানের জন্য বিভিন্নভাবে তদবির করে যাচ্ছেন তিনি।
এ বিষয়ে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত মিঠাপুকুরের সিএসআই এ এফ এম সাখাওয়াত হোসেন আমার দেশকে বলেন, এই মামলার চার্জশিটের দুই নম্বর কলামটি অব্যাহতিপ্রাপ্ত আসামিদের কলাম। এই কলামে কোনো আসামির নাম দিলেই সফটওয়্যারে অটোমেটিক্যালি ওই আসামিকে অব্যাহতি দেখাবে। মাদকদ্রব্যের এই মামলায় অব্যাহতির কলামে নাম দেওয়ায় এই আসামিকে পুলিশের পিসিপিআরে মামলা থেকে অব্যাহতি দেখাচ্ছে। এই দায় সম্পূর্ণ মামলার চার্জশিট দাখিলকারী কর্মকর্তার।
এ বিষয়ে ডিএনসির রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিদর্শক মেহেদুল বলেন, আমরা চার্জশিট দাখিল পর্যন্ত কাজ করি। এরপর আসামি কোথায় থাকে, এটা আমাদের জানা থাকে না। এর আগে সিরাজগঞ্জেও এভাবে চার্জশিট দিয়েছি। কোনো সমস্যা হয়নি। এর আগে আমি এভাবেই চার্জশিট দিয়েছি। তদন্তে যা পেয়েছি, তাই চার্জশিটে দিয়েছি। তবে ঘুস নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু আমার দেশকে বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ডিএনসি বরাবরই জনবল অপ্রতুলতার অজুহাত দেখায়। চার্জশিটে ভুল কলামে নাম দিয়ে পিসিপিআরে আসামি মোরছালিনকে অব্যাহতি দেখিয়ে বিদেশ পালানোর সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ছাড়াও ঊর্ধ্বতন যেসব কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে, তারা সবাই অপরাধী।
তিনি আরো বলেন, ডিএনসির রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিদর্শক মেহেদুল ও উপপরিচালক দিলারা সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন করেছেন। চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ডিএনসি রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক দিলারা রহমান বলেন, যে অভিযোগগুলো উঠেছে, এগুলো নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলব। মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আদালত অবজারভেশন দিলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তবে আমি কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নই। তাই ঘুস নেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

