একটি প্রাণহানির পর টনক নড়েছে প্রশাসনের। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) প্রধান ফটকসংলগ্ন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণসহ নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। দুর্ঘটনাস্থলে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে রাম্বল স্ট্রিপ স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। অবৈধ পার্কিং ও দখল উচ্ছেদে অভিযানে ১৫টি মামলায় ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নিহত শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাতের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।
মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরায় আইআইইউসির প্রধান ফটকের বিপরীতে ডালাস পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন মহাসড়কে দুর্ঘটনাটি ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য বাসের অপেক্ষায় সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাইশাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী। এ সময় পেছন থেকে একটি লরি বাসটিকে ধাক্কা দিলে বাসটি উল্টে শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে। বাসের নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন মাইশা। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় আহত হন আরও দুজন।
মাইশা ছিলেন আইআইইউসির ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তাঁর বাড়ি মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বটতকিয়া এলাকায়। বাবাকে হারানোর পর মা সালমা আক্তার দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার সামলাচ্ছিলেন। পরিবারের বড় সন্তান মাইশাকে ঘিরেই ছিল মায়ের অনেক স্বপ্ন। পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথেই সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে যায় সেই স্বপ্ন।
সহপাঠীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শোক ও ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে তাঁরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়, আটকে পড়ে ট্রেনও। শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবির মধ্যে ছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মামলা, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্ত চালককে গ্রেপ্তার, চালক ও গাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, কেডিএস ডিপোর অবৈধ পার্কিং বন্ধ, ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে যান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে দাবিগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক ও রেলপথ থেকে অবরোধ তুলে নেন। এরপরই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সড়ক নিরাপত্তায় পদক্ষেপ শুরু করে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, আইআইইউসির প্রধান ফটকসংলগ্ন এলাকায় ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি পাঠান জেলা প্রশাসক। একই দিন দুর্ঘটনাস্থলে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগেও চিঠি দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (৪ নভেম্বর) সেখানে রাম্বল স্ট্রিপ স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। তবে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হলেও প্রকল্প অনুমোদন ও নির্মাণকাজ শুরুর বিষয়টি এখনো বাকি।
এদিকে মহাসড়ক ও রেললাইনের মধ্যবর্তী এলাকায় অবৈধ পার্কিং ও দখল উচ্ছেদে বুধবার অভিযান চালায় জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দীপক ত্রিপুরার নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত কেডিএস ডিপোসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সড়কের দুই পাশে অবৈধভাবে রাখা যানবাহন সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এ সময় কেডিএস কর্তৃপক্ষের লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। অভিযানে ১৫টি মামলায় মোট ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি সড়ক প্রশস্তকরণের কাজও শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
মাইশার পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বিআরটিএর মাধ্যমে পরিবারটিকে পাঁচ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে এ অর্থ দেওয়া হবে। দুর্ঘটনায় জড়িত গাড়ির মালিকপক্ষ শনাক্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি মো. আমজাদ হোসেন বাদী হয়ে মঙ্গলবার সীতাকুণ্ড মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা চালকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলার নম্বর ১১। অভিযুক্ত চালককে গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
মাইশার মৃত্যু বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন মহাসড়কের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছে। প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে আশার সঞ্চার হলেও ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, সড়ক প্রশস্তকরণ এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

