নিজের জমিজমা বিক্রি করে চার মেয়েকে অর্থ দিয়েছিলেন। সম্পত্তির ভাগ থেকে বঞ্চিত রেখেছিলেন দুই ছেলেকে। নিজের কাছে থাকা সঞ্চয়ও নানা প্রয়োজনে খরচ করেছেন। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অসুস্থ শরীর নিয়ে যখন একটু আশ্রয় ও স্বজনের সান্নিধ্য প্রয়োজন, তখন সেই ছেলেদের বাড়িতেই ফিরতে আকুতি জানিয়েছেন ৮৫ বছর বয়সী শামসুল হক মোল্লা।
একসময় নিজের সিদ্ধান্তে সন্তানদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি করেছিলেন, আজ সেই সিদ্ধান্তের জন্যই অনুশোচনায় ভুগছেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছেন, ‘সন্তানদের নিঃস্ব করে নিজে খামখেয়ালি করা বোকামি।’
বুধবার দুপুরে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তর হিরণ গ্রামে কথা হয় শামসুল হকের সঙ্গে। জীবনের ভুল সিদ্ধান্ত, সন্তানদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দূরত্ব এবং শেষ বয়সে তাঁদের কাছে ফিরে আসার আকুতির কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
শামসুল হক বলেন, ‘আমি ভুল করেছি। ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই আজ আমার এমন পরিণতি। সন্তানদের ঠকিয়েছি, তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করেছি। আমার মতো ভুল যেন আর কোনো বাবা না করেন। জীবনের শেষ কটা দিন সন্তানদের নিয়ে, পরিবারের সঙ্গে থাকতে চাই।’
একসময় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সাজানো সংসার ছিল তাঁর। নিজের উপার্জন ও সম্পদ দিয়ে সন্তানদের বড় করেছেন। কিন্তু প্রায় তিন বছর আগে জমিজমা বিক্রির পর সেই অর্থ বণ্টনে দুই ছেলেকে কোনো টাকা দেননি। চার মেয়েকে কিছু অর্থ দিয়ে অবশিষ্ট টাকা নিজের কাছে রেখেছিলেন। এরপর সেই টাকা থেকে কিছু অর্থ ব্যয় করে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গেলেও অসুস্থতার কারণে ওমরাহ সম্পন্ন না করেই দেশে ফিরতে হয় তাঁকে।
দেশে ফিরে কখনো মেয়েদের বাড়িতে, কখনো মসজিদ-মাদ্রাসায় সময় কাটিয়েছেন। নিজের কাছে থাকা টাকা থেকে কাউকে ধার দিয়েছেন, কিছু অর্থ দান করেছেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে। আবার কিছু টাকা হারিয়েও ফেলেছেন। এভাবে একসময় তাঁর হাতে থাকা অর্থও কমে আসে। অন্যদিকে সম্পত্তি বণ্টনের কারণে দুই ছেলের সঙ্গেও তৈরি হয় দূরত্ব।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর আগে বড় ছেলে আজিজুলের মেয়ের নামে পাঁচ কাঠা জমি লিখে দিয়েছিলেন শামসুল হক। পরবর্তী সময়ে শামসুল হক বাড়ির জায়গা অন্যত্র বিক্রি করে দিলে ওই জমি ভাতিজির কাছ থেকে কিনে নেন ছোট ছেলে রিয়াজুল। এ ছাড়া অন্যের কাছে বিক্রি করা জমি থেকে আরও তিন কাঠা জমি কিনে সেখানে বসতি গড়েছেন তিনি। বড় ছেলে আজিজুল কোনো জমি কিনতে পারেননি। বর্তমানে বাড়িতে এলে ছোট ভাইয়ের বাড়িতেই থাকেন তিনি। তাঁর স্ত্রী-সন্তানেরা ঢাকায় বসবাস করেন।
বড় ছেলে আজিজুল বলেন, ‘বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিন আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। তিনি আমাদের সঙ্গে থাকতেন না। বাবা আমাদের হক থেকে বঞ্চিত করেছেন। বোনদের টাকা দিয়েছেন, নিজের টাকাও খরচ করেছেন। আমি কোনো জায়গা কিনতে পারিনি। তবে তাই বলে বাবাকে ফেলে দেব না। আমরা চেষ্টা করব, বাকি জীবন তাঁকে ভালো রাখতে।’
তবে মেয়েদের বক্তব্যে উঠে এসেছে পারিবারিক বিরোধের আরেকটি দিক। বড় মেয়ে মায়া বেগমের দাবি, বাবাকে তিনি নিজের বাড়িতে রেখেছিলেন। কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে বিরোধের পর বাবা নিজেই বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
মায়া বেগম বলেন, ‘বাবাকে আমার কাছে রাখতাম। তবে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতেন। প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগে আমার কাছে গচ্ছিত রাখা টাকা ফেরত চান বাবা। তাঁর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমি সেই টাকা দিতে অনীহা প্রকাশ করি। এ নিয়ে বাবা থানা-পুলিশের শরণাপন্ন হন। পরে আমার কাছ থেকে টাকা বুঝে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে যান। এরপর থেকে বাবা আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাবা সেজো বোনের বাড়ি থেকে এসে তাঁর ভাগ্নের দোকানের সামনে রাস্তায় অবস্থান করছেন, এটা আমরা জানতাম না।’
মায়া বেগম জানান, সর্বশেষ সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে বসবাসরত ছোট মেয়ে কাজুলী বেগমের কাছে ছিলেন শামসুল হক। কিন্তু অভাব-অনটনের সংসারে নবজাতক সন্তান ও অসুস্থ বাবার দেখাশোনা করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
সোমবার বিকেলে সেজো মেয়ে সালমা বেগমের কুরপালা গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়ি থেকে নিজ গ্রাম উত্তর হিরণে আসেন শামসুল হক। সেখানে দুই রাত মসজিদে কাটান। পরে বাড়ির পাশের একটি গাছতলায় তাঁর অবস্থানের বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও অভিযোগ ওঠে, জমিজমা লিখে নেওয়ার পর সন্তানরা তাঁকে আশ্রয় দিচ্ছেন না। তবে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ ও সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে টানাপোড়েনের বিষয়টি।
বিষয়টি জানার পর এগিয়ে আসে উপজেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সন্ধ্যায় কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফ-উল-আরেফীন উত্তর হিরণ গ্রামে গিয়ে শামসুল হকের দুই ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। অসুস্থ বাবাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে তাঁর দেখাশোনার অনুরোধ জানান। ইউএনওর পরামর্শ ও গ্রামবাসীর অনুরোধে বুধবার সকালে দুই ছেলে বাবাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেন।
শামসুল হকের ভাতিজা জামাল মোল্লা বলেন, ‘প্রকৃত ঘটনা না জেনে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একপাক্ষিক সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। সংবাদ দেখে ইউএনও সাহেব আমাদের এলাকায় এসেছিলেন। পরে তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে আমরা শামসুল হকের পুরো ঘটনা জানাই। স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রামবাসী তাঁর ছেলেদের মানবিক বিবেচনায় বাবাকে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করি। বুধবার সকালে ছেলেরা তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।’
প্রতিবেশী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান মৃধা বলেন, ‘বাড়ির জায়গাজমি বিক্রির আগে থেকেই শামসুল হক আলাদা থাকতেন। জমি বিক্রির পর তিনি আর এ বাড়িতে আসেননি। দুই ছেলেকে তিনি সম্পত্তির হক থেকে বঞ্চিত করেছেন। সমাজে শামসুল হকের আজকের পরিণতি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’
তবে বৃদ্ধ বাবাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিলেও তাঁর দেখাশোনা নিয়ে ছোট ছেলের পরিবারকে বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। ছোট ছেলে রিয়াজুলের স্ত্রী হাফিজা বেগম বলেন, ‘তিনি এখন কোনো প্রকার চলাফেরা করতে পারেন না। তাঁকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, চিকিৎসার খরচ জোগানো ও ভরণপোষণ করা আমাদের মতো দরিদ্র পরিবারের জন্য অনেকটাই কষ্টসাধ্য। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব তাঁকে ভালো রাখতে।’
কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফ-উল-আরেফীন বলেন, শামসুল হকের বিষয়টি জানার পর তিনি সরেজমিনে খোঁজখবর নেন এবং তাঁর সন্তানদের সঙ্গে কথা বলেন। অসুস্থ বাবার শেষ বয়সে নিরাপদ আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় দেখাশোনা নিশ্চিত করার জন্য ছেলেদের অনুরোধ করেন। পারিবারিক বিরোধ ভুলে মানবিক বিবেচনায় বাবার পাশে দাঁড়ানোর বিষয়েও তাঁদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিবারের মধ্যে সমঝোতা এবং বৃদ্ধের দেখভাল নিশ্চিত করাই ছিল প্রশাসনের উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
শামসুল হকের জীবনের এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের গল্প নয়; এর মধ্যে রয়েছে বার্ধক্যের নিরাপত্তা, সন্তানদের প্রতি বৈষম্য এবং জীবনের শেষ সময়ে আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তার কঠিন বাস্তবতা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে নিজের শেষ বয়সের নিরাপত্তা উপেক্ষা করা যে কত বড় ঝুঁকি, তা উপলব্ধি করছেন এই বৃদ্ধ। একই সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে অভিমান কিংবা বিরোধ থাকলেও অসুস্থ ও অসহায় মা-বাবার পাশে দাঁড়ানো যে সন্তানদের মানবিক দায়িত্ব, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে শামসুল হকের জীবনচিত্র।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

