লালমাই পাহাড়ের চূড়ায় ৯০ হাজার চা গাছ

লালমাই পাহাড়ের চূড়ায় ৯০ হাজার চা গাছ

প্রথমবারের মতো লালমাই পাহাড়ের বুকে গড়ে উঠেছে চা বাগান। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় ধর্মপুর এলাকায় প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এ বাগানে রয়েছে ৯০ হাজারের মতো চা গাছ। ২০২৭ সালে চা পাতা সংগ্রহ করে উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন উদ্যোক্তা তারিকুল ইসলাম মজুমদার। ভবিষ্যতে উৎপাদিত চা জাপানের বাজারে রপ্তানিরও আশা করছেন তিনি।

লালমাই পাহাড়ে বৃষ্টি তুলনামূলক কম হয়। ফলে চা বাগানে পানির সংকট মোকাবিলায় কৃত্রিম সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কয়েকজন চা শ্রমিক বাগানে কাজ করছেন। তাদের সিলেট থেকে আনা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

উদ্যোক্তা তারিকুল জানান, ছোটবেলা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। লালমাই পাহাড়ি এলাকায় বেড়ে ওঠায় কলেজজীবন থেকেই পাহাড়ে চা বাগান করার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু পাহাড়ের মাটি ও তুলনামূলক কম বৃষ্টির কারণে চা চাষের উদ্যোগ নিয়ে কয়েকবার ব্যর্থ হন তিনি।

২০২১ সালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বন্ধু জিদি সানকে নিজের এলাকায় নিয়ে আসেন তারিকুল। তাকে নিয়ে লালমাই পাহাড় ঘুরে নিজের চা বাগান করার স্বপ্নের কথা জানান। পরে জিদি সান পাহাড়ের মাটি সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য নিয়ে যান। পরীক্ষা শেষে তিনি জানান, লালমাই পাহাড়ে চা চাষ সম্ভব।

এরপর তার সহযোগিতায় মৌলভীবাজার থেকে বিটি-২ জাতের ছয় হাজার চা গাছের চারা সংগ্রহ করেন তারিকুল। প্রতি চারা ৪৫ টাকা দরে কিনে এক একর জায়গায় সেগুলো রোপণ করেন। ধীরে ধীরে বাগানের পরিধি বাড়তে থাকে। বর্তমানে প্রায় তিন একর জায়গায় রয়েছে ৯০ হাজার চা গাছ। ভবিষ্যতে লক্ষাধিক চারা লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।

তবে চা উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা। বাগান থেকে কয়েকবার চা পাতা সংগ্রহ করা হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণের মেশিন না থাকায় সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা সম্ভব হয়নি।

তারিকুল বলেন, ‘চা প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি মেশিনের দাম প্রায় ৮০ লাখ টাকা। আমার এই ছোট বাগানে যে পরিমাণ চা উৎপাদন হবে, তাতে এককভাবে মেশিন বসিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয়। আমার মতো আরো উদ্যোক্তা যদি পাহাড়ের টিলায় চা চাষে এগিয়ে আসেন, তাহলে সমন্বিতভাবে মেশিন বসিয়ে চা প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হতে পারে।’

জাপানে চা রপ্তানির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভালোভাবে চা প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে জাপানে রপ্তানি করার আশা করছি। সেখানে রপ্তানি করতে পারলে বড় একটি বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।’

তারিকুলের ‘মজুমদার টি গার্ডেন’ বড় ধর্মপুর এলাকায়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে গেলেই বাগানটির দেখা মেলে। কুমিল্লার প্রথম চা বাগান হওয়ায় প্রতিদিনই বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা সেখানে ছুটে আসছেন। তবে অনেক সময় দর্শনার্থীরা চা পাতা ছিঁড়ে ফেলায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তা তারিকুল। তিনি বলেন, ‘দর্শনার্থীরা বাগান দেখতে আসেন—এটা আমার জন্য আনন্দের। কিন্তু অনেকে চা পাতা ছিঁড়ে ফেলেন। এতে বাগানের ক্ষতি হয়। তিনি দর্শনার্থীদের চা পাতা না ছেঁড়ার অনুরোধ করেন।

চা বাগান দেখতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী আসিফ ভূঁইয়া বলেন, অনেক দিন ধরে শুনে আসছি লালমাইয়ে চা বাগান হয়েছে। তাই বন্ধুদের সঙ্গে দেখতে এসেছি। জীবনের প্রথম চা গাছ ও চা পাতা দেখে বেশ ভালো লাগছে।

আমজাদ হোসেন নামে আরেক দর্শনার্থী বলেন, লালমাই পাহাড়ের টিলা এমনিতেই সুন্দর। তার সঙ্গে সবুজ চা বাগান যুক্ত হওয়ায় জায়গাটির সৌন্দর্য আরো বেড়েছে।

সদর দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জুনায়েদ কবির খান বলেন, ‘তারিকুল যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা ব্যতিক্রমী। কৃষি অফিস থেকে বড় ধরনের সহযোগিতার সুযোগ না থাকলেও বিভিন্ন বিষয়ে তাকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চা পাতায় কীটের আক্রমণ হলে তা দমনে সহযোগিতা করা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, তার মতো আশপাশের আরো অনেকে চা চাষে এগিয়ে এলে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।

সম্প্রতি চা বাগানটি পরিদর্শনে আসেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কুমিল্লার উপপরিচালক মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কুমিল্লা অঞ্চলে বৃষ্টি কম হওয়ায় এখানকার মাটি চা চাষের জন্য তেমন উপযুক্ত নয়। তারপরও তারিকুলের উদ্যোগকে শ্রদ্ধা জানাতে হয়। আমরা লালমাই পাহাড়ের মাটি আরো পরীক্ষা করে দেখব।’

তিনি আরো বলেন, আগামী বছর থেকে ছোট পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাচ্ছে এ বাগানটি। আমরা পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছি।

উদ্যোক্তা তারিকুল আমার দেশকে বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে ভর্তুকি দিয়ে চা বাগানের পরিচর্যা করে যাচ্ছি। ২০২৭ সালে আমরা চা পাতা সংগ্রহে যাব। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন