ফায়ার কর্মীরা যেখানে ঢুকতে পারেননি, সেখানে ঝুঁকি নিয়ে ৭ লাশ উদ্ধার সাইফুলের

ফায়ার কর্মীরা যেখানে ঢুকতে পারেননি, সেখানে ঝুঁকি নিয়ে ৭ লাশ উদ্ধার সাইফুলের
ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন অকুত ভয় সাইফুল গনি। ছবি: আমার দেশ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনায় যখন শিপইয়ার্ডজুড়ে নেমে এসেছে আতঙ্ক ও শোক, তখন মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল গনি। ঘটনাস্থল থেকে তখনো বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হচ্ছিল। পরিস্থিতি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল যে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলও নিরাপত্তার কারণে স্বাভাবিকভাবে ভেতরে প্রবেশ করতে পারছিল না।

এমন অবস্থায় পরিচিত ও প্রতিবেশীদের লাশ পড়ে থাকার খবর পেয়ে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সাইফুল। শিপইয়ার্ডের গেটে প্রথমে বাধার মুখে পড়লেও একপর্যায়ে ভেতরে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি উপেক্ষা করে একে একে সাতটি লাশ উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসেন। স্থানীয় গ্রামবাসীরাও এ সময় তাকে সহযোগিতা করেন।

বিজ্ঞাপন

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিপইয়ার্ডে ছুটে যান সাইফুল। ভেতরে কয়েকজন শ্রমিকের লাশ পড়ে থাকার খবর তাকে আর ঘরে বসে থাকতে দেয়নি। চারদিকে বিষাক্ত গ্যাসের আতঙ্ক, যে গ্যাসে ইতিমধ্যে প্রাণ গেছে শ্রমিকদের; তবু পরিচিত মানুষগুলোর লাশ ফেলে রাখতে পারেননি তিনি। একপর্যায়ে শিপইয়ার্ডের ভেতরে ঢুকে ঘটনার কেন্দ্রে পৌঁছান এবং একে একে সাত লাশ উদ্ধার করেন।

সাইফুল গনি বলেন, নিহতদের কয়েকজন আমার এলাকার মানুষ, কেউ প্রতিবেশী। তাদের লাশ সেখানে পড়ে আছে- এটা জানার পর ঘরে বসে থাকা সম্ভব ছিল না। জীবনের ঝুঁকি জেনেও তাদের উদ্ধারে ঘটনাস্থলে যাই। উদ্ধারকাজে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় গ্রামবাসীরাই এগিয়ে আসেন।

সাইফুল অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর শিপইয়ার্ডের ভেতরে কর্তৃপক্ষের কাউকে তিনি দেখতে পায়নি। এমনকি ঘটনাস্থলে কোনো অ্যাম্বুলেন্সও ছিল না। উদ্ধারকাজে শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

এদিকে কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মামুন জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাস্থল থেকে তখনো প্রচুর গ্যাস নির্গত হচ্ছিল। ফলে সেখানে প্রবেশ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। বিষাক্ত গ্যাসে উদ্ধারকারীরাও আক্রান্ত হতে পারেন। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সেখানে গিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল না বলে জানান তিনি। ফলে ঘটনাস্থলে আরও কোনো লাশ রয়েছে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

স্থানীয়দের কেউ কেউ ভেতরে আরও লাশ থাকার আশঙ্কা করলেও গ্যাসের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে পুরো এলাকা নিরাপদে তল্লাশি করা সম্ভব হয়নি।

এ ঘটনায় মোট নয় শ্রমিকের মৃত্যুর কথা জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে ভাটিয়ারীর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মৌলভীপাড়ার দুই সহোদর মো. মনসুর ও মো. নাসির এবং একই ওয়ার্ডের শনি ঠাকুরপাড়ার পলাশ জলদাশ ও সানি জলদাশ রয়েছেন। পাশাপাশি গ্রামের চারজনের মৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। একসঙ্গে এতগুলো প্রাণহানির ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।

প্রথমদিকে ঘটনাটিকে গ্যাস বিস্ফোরণ বলে ধারণা করা হলেও পরবর্তী পর্যবেক্ষণে গ্যাস লিকেজ ও বিষক্রিয়ার বিষয়টি সামনে আসে। কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, টক্সিক গ্যাসের বিষক্রিয়ায় শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে।

দুই দপ্তরের বক্তব্যে গ্যাসের ধরন নিয়ে মতভিন্নতা থাকায় এর প্রকৃত ধরন, উৎস, ঘনত্ব এবং কীভাবে গ্যাস ট্যাংকের ভেতরে জমেছিল, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা এখন।

দুর্ঘটনার পর শিপইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ট্যাংকে শ্রমিক প্রবেশের আগে গ্যাস শনাক্তকরণ ও মাত্রা পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, ট্যাংক যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছিল কি না এবং জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রস্তুত ছিল কি না, এসব বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি থাকলে তার দায়ও নির্ধারণের দাবি উঠেছে।

এর মধ্যেই সাইফুল গনির সাহসিকতার ঘটনা এলাকায় আলাদা করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শিপইয়ার্ড এলাকা পরিদর্শনে যান বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী এফসিএ। এ সময় সাইফুল তার কাছে উদ্ধার অভিযানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সাইফুলের কথা শুনতে চারপাশে জড়ো হন স্থানীয়রা।

বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকির মধ্যেও কীভাবে তিনি একে একে সাতটি লাশ উদ্ধার করেছেন, তা শোনেন উপস্থিত জনতারা।

একদিকে নয়টি পরিবারের স্বজন হারানোর শোক, অন্যদিকে মৃত্যুর ভয় উপেক্ষা করে প্রতিবেশীদের লাশ উদ্ধারে একজন সাধারণ মানুষের এগিয়ে আসা, ভাটিয়ারীর এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় দুটি দৃশ্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। যেখানে বিষাক্ত গ্যাসের কারণে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীরাও প্রবেশে ঝুঁকি অনুভব করেছেন, সেখানে সাইফুল নিজের জীবনের নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করে সাতটি লাশ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার এই ভূমিকা কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের অংশ ছিল না, ছিল প্রতিবেশীর প্রতি দায়বদ্ধতা ও মানুষের প্রতি মানুষের টান থেকে।

তাই ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার অন্ধকারের মধ্যেও সাইফুল গনির সাহসিকতা হয়ে উঠেছে এক উজ্জ্বল মানবিক গল্প, বিপদের মুহূর্তে মানুষ যে মানুষের জন্যই সবচেয়ে বড় আশ্রয়, তারই মর্মস্পর্শী প্রমাণ।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন