ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে কাপ্তাই লেকের পানি, সামনে সংকটের আশঙ্কা

ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে কাপ্তাই লেকের পানি, সামনে সংকটের আশঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

বর্ষার পানি ধরে রাখার বদলে ধারণক্ষমতার অনেক নিচেই কাপ্তাই লেকের পানি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ন্যূনতম দুটি ইউনিট সচল রাখা এবং চট্টগ্রাম নগরীর পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার দাবি, লেকের পানি কমে গেলে কর্ণফুলী ও হালদায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ বাড়বে। এতে নগরীর পানি শোধনাগারগুলোর উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে।

চলতি বছর কাপ্তাই লেকের পানির উচ্চতা একবারও এর সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুটের কাছাকাছি যায়নি। বরং ১০৫ ফুটের কিছু বেশি হলেই একাধিকবার খোলা হয়েছে লেকের ১৬টি জলকপাট বা স্পিলওয়ে। এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। ৩০ আগস্ট পিডিবিকে চিঠি দেওয়ার পরও পানি ছাড়ার কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপও চেয়েছে সংস্থাটি।

বিজ্ঞাপন

বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি কাপ্তাই লেকে সংরক্ষণ করে পাঁচটি ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। পানি কমতে শুরু করলে পর্যায়ক্রমে ইউনিট বন্ধ করা হলেও নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত অন্তত দুটি ইউনিট সচল রাখার নির্দেশনা রয়েছে। এর অন্যতম কারণ কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে লবণাক্ততার প্রবেশ ঠেকানো। সব মিলিয়ে বর্ষায় কতটুকু পানি জমা রাখা হবে, এই মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। বিগত বছরগুলোয় আগস্টের শেষে ১০৮ এমএসএলের বেশি পানি সংরক্ষণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢলে ১০৮ ফুটের উপরে পানি উঠে গেলে জলকপাট খুলে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু চলতি বছর পানির উচ্চতা ১০৫ ফুট ছুঁলেই খুলে দেওয়া হচ্ছে স্পিলওয়ে বা জলকপাট।

এতে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসার কপালে। কারণ, বর্ষা মৌসুমে লেকে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ করা না হলে শুষ্ক মৌসুমে পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভয়াবহ পানি সংকট দেখা দেবে চট্টগ্রাম মহানগরীতে। কারণ, চট্টগ্রাম ওয়াসার সবকটি পানি শোধনাগারই কর্ণফুলী ও হালদা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমেও কাপ্তাই লেক থেকে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ না থাকলে জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা পানিতে প্লাবিত হবে কর্ণফুলী ও হালদা। এতে সংকটে পড়বে ওয়াসা।

২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হালদায় লবণাক্ততা ঠেকাতে নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অন্তত দুটি টারবাইন সচল রাখার নির্দেশনা রয়েছে। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্ষা মৌসুমের শেষে আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বরের শুরুতে ১০৯ ফুট ধারণক্ষমতার লেকে অন্তত ১০৮ ফুট পানি সংরক্ষণের লক্ষ্য থাকে। এ সময় সবকটি ইউনিট চালু রাখা হলেও বর্ষা মৌসুমের শেষে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে পর্যায়ক্রমে তিনটি পর্যন্ত ইউনিট বন্ধ করে দিতে হয়। তবে চলতি বছর জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত কাপ্তাই লেকে পানির মজুত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম ছিল এবং নির্ধারিত ‘রুল কার্ভ’-এর মানদণ্ডেরও নিচে ছিল বলে জানিয়েছে ওয়াসা।

১০৫ ফুট হলেই খুলছে জলকপাট

চলতি বছর কাপ্তাই লেকে একাধিকবার স্পিলওয়ে খুলে দেওয়া হয়েছে পানি ছাড়ার জন্য। ওয়াসা সূত্র জানায়, সবশেষ হিসাবে কাপ্তাই লেকে পানির উচ্চতা ১০৫.৫১ ফুট। অথচ অন্যান্য বছর এ সময় পানির উচ্চতা ১০৮ ফুটের বেশি থাকে। এভাবে পানি ছাড়তে থাকলে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই পানির স্তর ১০২ ফুটের নিচে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ওয়াসা।

ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে অন্তত দুটি ইউনিট সচল রাখতে গেলে আগামী এপ্রিলের আগেই পানির স্তর ৭০ ফুটের নিচে নেমে যেতে পারে। এই স্তরকে লেকের ‘ডেড স্টোরেজ’ পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই স্তরে পৌঁছালে লেক কার্যত পানিশূন্য হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়বে। এতে লেকের পানির ওপর নির্ভরশীল দুর্গম এলাকাগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। গত ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) এবং পরদিন ৩১ আগস্ট রাউজানের চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়ে এই শঙ্কার কথা জানায় চট্টগ্রাম ওয়াসা।

জানা গেছে, চলতি বছরের ১৮ জুলাই থেকে পাঁচ দিন স্পিলওয়ে খুলে পানি ছাড়া হয়। তখন পানির উচ্চতা ছিল ১০৪.১২ ফুট। পাঁচ দিন পর তা নেমে দাঁড়ায় ১০৩.৩৮ ফুটে। এরপর ২৯ আগস্ট পানির উচ্চতা ১০৬.১ ফুটে উঠলে আবার স্পিলওয়ে খোলা হয়। আট দিন পানি ছাড়ার পর ৬ সেপ্টেম্বর পানির উচ্চতা নেমে আসে ১০৪.৯৮ ফুটে। পাঁচ দিনের ব্যবধানে তা ১০৫.৫১ ফুটে উঠলে ১১ সেপ্টেম্বর আবার ছয় ইঞ্চি করে ১৬টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়। ওয়াসার দাবি, অতীতে কখনো ১০৮ ফুটের নিচে এভাবে পানি ছাড়া হয়নি।

ওয়াসার শঙ্কা, দিনে ঘাটতি হতে পারে ১০ কোটি লিটার

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম জানান, হালদার পানি পরিশোধন করে মোহরা ও মদুনাঘাট শোধনাগারের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৮ কোটি লিটার পানি চট্টগ্রাম শহরে সরবরাহ করা হয়। লবণাক্ততা বেড়ে গেলে এসব শোধনাগারের উৎপাদন কমাতে হয়।

তিনি বলেন, কাপ্তাই লেকের দুটি টারবাইন সচল না থাকলে চট্টগ্রামে দৈনিক আট থেকে ১০ কোটি লিটার পর্যন্ত পানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এই ঘাটতি পূরণের মতো বিকল্প পানির উৎস বর্তমানে নেই।

তার মতে, নগরবাসীকে আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটে ফেলতে না চাইলে এখনই বিদ্যুৎ উৎপাদন, পানি সংরক্ষণ ও কর্ণফুলীর প্রবাহের মধ্যে ভারসাম্য রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হস্তক্ষেপ চেয়েও সাড়া না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জেলা প্রশাসনের নির্দেশেই পানি ছাড়া হচ্ছে

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ম্যানেজার মাহামুদ হাসান জানান, লেক ম্যানেজমেন্ট সাব-কমিটির সভাপতি রাঙামাটির জেলা প্রশাসক। জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে উচ্চতা ১০৫ ফুটের উপরে গেলে পানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী প্রতিদিন পানির উচ্চতার তথ্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে। উচ্চতা ১০৫ ফুট ছাড়ালেই স্পিলওয়ে খুলতে চাপ দেওয়া হয়।

তিনি জানান, নিয়মানুযায়ী স্পিলওয়ে খোলার অন্তত আট ঘণ্টা আগে আপস্ট্রিম ও ডাউনস্ট্রিমের সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডার চট্টগ্রাম বন্দর, ওয়াসা ও নৌবাহিনীকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ২৯ আগস্ট পানির উচ্চতা ১০৫ ফুট পার হওয়ার পর রাত ১০টায় স্পিলওয়ে খোলার নোটিস দেওয়া হলেও জেলা প্রশাসকের চাপে রাত ৮টায় জলকপাট খুলতে হয়।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক ও লেক ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নাজমা আশরাফী বলেন, কাপ্তাই লেকের বিভিন্ন এলাকায় জনবসতি রয়েছে। সব দিক বিবেচনা করে পানির পরিমাণ নির্ধারণে প্রতি মাসে সাব-কমিটির বৈঠক হয়। সেখানে প্রায় সব সেক্টরের প্রতিনিধি রয়েছেন।

তিনি বলেন, সবশেষ বৈঠকে কমিটির সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ছিল—লেকের পানির উচ্চতা ১০৫ ফুটের উপরে উঠলে পানি ছেড়ে দিতে হবে। এটি তার একক সিদ্ধান্ত নয়। ১৫ সেপ্টেম্বর (আজ) ফলোআপ বৈঠক রয়েছে। সেখানে পানির উচ্চতা বাড়ানোর বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত হলে তা বাস্তবায়ন করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন