চট্টগ্রামে জ্বরের প্রকোপ, বাড়ছে ডেঙ্গু আতঙ্ক

চট্টগ্রামে জ্বরের প্রকোপ, বাড়ছে ডেঙ্গু আতঙ্ক
চট্টগ্রামে জ্বরের প্রকোপ, বাড়ছে ডেঙ্গু আতঙ্ক। ছবি: আমার দেশ

ডেঙ্গুর প্রকোপের মধ্যেই চট্টগ্রামে বাড়ছে ভাইরাসজনিত জ্বর, সর্দি-কাশি ও গলাব্যথা। আবহাওয়ায় পরিবর্তনের পালা, দিনে গরম রাতে ঠান্ডা। আজ প্রখর রোদ তো কাল মেঘলা- এমন অস্থির আবহাওয়ার মধ্যেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘরে ঘরে জ্বর-কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছেন শিশু থেকে বয়স্করা। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে জ্বর নিয়ে তৈরি হচ্ছে আতঙ্ক। চিকিৎসকরা আতঙ্কিত না হতে বললেও হাসপাতালের চিত্র উদ্বেগ ছড়াচ্ছে।

হাসপাতালে চিকিৎসক, রোগী ও স্বজনরা জানান, হালকা বৃষ্টির পর তাপমাত্রার ওঠানামায় অনেকের মধ্যে জ্বর, কাশি, গলাব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া ও শরীর ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। পরিবারের একজন আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সদস্যদের মধ্যেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। এতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। ডেঙ্গু ভেবে আতঙ্কিত হচ্ছে জ্বরে আক্রান্ত একই পরিবারের সদস্যরা।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসকদের মতে, বৃষ্টিতে ভিজলেই সরাসরি ভাইরাস জ্বর হয়- এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তনে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ওঠানামা, মানুষের ঘনিষ্ঠ অবস্থান এবং আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি সংক্রামক শ্বাসতন্ত্রের রোগ, যা নাক, গলা ও ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। বাংলাদেশে এ ধরনের সংক্রমণ পর্যবেক্ষণে জাতীয় ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভেইলেন্স কার্যক্রমও রয়েছে।

সম্প্রতি জ্বরে আক্রান্ত চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইয়াসির আরাফাত জানান, কয়েকদিন ধরে কখনো প্রচণ্ড গরম, আবার কখনো হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির পর তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় অনেকেই ঠান্ডা অনুভব করছেন। এরপর শুরু হচ্ছে জ্বর, কাশি, গলাব্যথা কিংবা নাক দিয়ে পানি পড়া। পরিবারের একজন আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সদস্যদের মধ্যেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।

বারডেমের চিকিৎসক রাকিবুল হোছাইনের মতে, ভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে সাধারণত জ্বর, কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা, নাক দিয়ে পানি পড়া বা নাক বন্ধ হওয়ার মতো উপসর্গ থাকতে পারে। কারো ক্ষেত্রে জ্বর কম হলেও শরীরের দুর্বলতা ও কাশি কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে। তবে এসব উপসর্গ থাকলেই সেটিকে ভাইরাসজনিত জ্বর হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগেও জ্বর, শরীর ব্যথা ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে জ্বরের ১০ দিনের মাথায় আইসিটি ফর ডেঙ্গু পরীক্ষায় সংক্রমণের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়।

এর মধ্যেই চট্টগ্রামে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ‘চট্টগ্রাম জেলায় বছরভিত্তিক ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রতিবেদন’-এ চলতি বছরের আক্রান্ত ও মৃত্যুর চিত্র উঠে এসেছে। চলিত বছর ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩,১২৭ জন। এ সময় মারা গেছেন ১৪ জন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরের ১৮ দিনেই ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জানুয়ারিতে ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭ এবং জুনে ১২২ জন আক্রান্ত হন। জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৬ জনে। ওই মাসে মারা যান দুজন। এক মাসের ব্যবধানে আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়। এই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ১,২০২ জন এবং মারা যান আরো দুজন। শুধু সেপ্টেম্বরের ১৬ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ১,০৯১ জন এবং মারা গেছেন ৯ জন।

এদিকে ডেঙ্গুর পাশাপাশি মৌসুমি জ্বর নিয়েও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাসান হাফিজ জানান, হালকা বৃষ্টিতে ভেজার পর রাতে জ্বর ও বমি শুরু হয়। তিন দিন জ্বরে ভোগার পর ডেঙ্গু পরীক্ষা করালে ফল নেগেটিভ আসে। বর্তমানে তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল।

চট্টগ্রামে একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে অনেকেই জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় মানুষের মধ্যে আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। জ্বর হলেই ডেঙ্গু হয়েছে ধরে নিয়ে অনেকে দ্রুত হাসপাতালে ছুটছেন, আবার কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাচ্ছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, একই ধরনের উপসর্গ হলেও রোগের কারণ ভিন্ন হতে পারে। তাই জ্বর হলে পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আশিকুল ওহাব চৌধুরী জানান, জ্বরের কারণ নির্ণয় না করে নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মৌসুমে জ্বরকে অবহেলা করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি প্রতিটি জ্বরকে ডেঙ্গু ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জ্বরের কারণ নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কয়েকদিন ধরে জ্বর থাকার পর, জ্বর কমে যাওয়ার পরও অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, বারবার বমি, ডায়রিয়া, অস্বাভাবিক রক্তপাত কিংবা শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ সেবন না করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ভাইরাসজনিত সংক্রমণ থেকে সুরক্ষায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিরাপদ পানি পান, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং ভেজা কাপড় দ্রুত পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চললে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে জ্বর নিয়ে আসা রোগীর চাপ বেড়েছে। জায়গা না থাকায় কোনো কোনো ওয়ার্ডে ফ্লোরেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। ওসেক অবজারভেশন ওয়ার্ডেও রয়েছে রোগীর চাপ।

চমেক হাসপাতালের ১৩, ১৪ ওয়ার্ডে জ্বর, কাশি, গলাব্যথার রোগী ও ১৬ নম্বর ডেঙ্গু ওয়ার্ডে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় ফ্লোরিং করেও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। মৌসুমি জ্বর, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন অনেকে।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন জানান, নগর ও জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রেফার হয়ে রোগীরা চমেকে আসেন। সিট না থাকলেও রোগীদের ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে মৌসুমি জ্বর ও কাশির রোগীর চাপও বাড়ছে। ডেঙ্গু নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক থাকায় জ্বর হলেই অনেকে হাসপাতালে ছুটে আসছেন। এতে হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ বাড়ছে।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম হোসেন জানান, চলতি মাসে জ্বর নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। প্রায় আড়াইশ শয্যার হাসপাতালে চার শতাধিক রোগী ভর্তি রয়েছেন। প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ৩,০০০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডেঙ্গু ও সাধারণ ওয়ার্ডে কোনো বেড খালি নেই। তবে সাধারণ জ্বরের রোগীরা তিন দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। প্রতিদিনই জ্বরের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. সাজেদুর রহমান জানান, ডেঙ্গু ও হাম পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে সাধারণ জ্বর নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে, যার তথ্য ডেটায় রয়েছে। চলতি মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বাড়ার পাশাপাশি ঋতু পরিবর্তনে ভাইরাস জ্বরের প্রকোপ বাড়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্কও বেড়েছে। এ বিষয়ে নির্দেশনা ও তদারকি আরো বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ডেঙ্গুর পাশাপাশি মৌসুমি ভাইরাসজনিত জ্বর-কাশিতে বাড়ছে রোগীর চাপ। জ্বর হলেই ডেঙ্গু ভেবে আতঙ্কিত না হয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন