বৃষ্টি হয়েছে ১০২ মিলিমিটার

দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে ভাসছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন

কুমিল্লা প্রতিনিধি

দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে ভাসছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সামনে জলাবদ্ধতা । ছবি: আমার দেশ

দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে পানিতে ভাসছে কুমিল্লা নগরী। ১৫ বছর আগে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পরও প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখেনি সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ । ফলে কয়েক মিলিমিটার বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় কুমিল্লা নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক; যার কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয় নগরবাসীকে।

দেশের অন্যতম প্রাচীন পৌর শহর কুমিল্লা ২০১১ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১২ সালে প্রথম ও ২০১৭ সালে দ্বিতীয় দফায় মেয়র নির্বাচিত হন মনিরুল হক সাক্কু। দুটি নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি জলাবদ্ধতা নিরসনের থাকলেও দিনে দিনে বাড়ছে এ সমস্যা।

বিজ্ঞাপন

১০ বছর মেয়াদেও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে পারেননি তিনি। তারপর ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের আরফানুল হক রিফাত এবং তাহসিন বাহার সূচনা দুই বছর মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। তারাও জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখেননি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সরকারের দুজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করলেও এখন দায়িত্ব পেয়েছেন কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু। গত এক মাস ধরে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

মঙ্গলবার সকালে নগরীতে ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় কুমিল্লা নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক। এতে ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষসহ স্কুলগ্রামী শিক্ষার্থীরা।

মঙ্গলবার সকালের দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়, স্টেডিয়াম রোড, বাগিচাগাঁও, ছোটরা, রেসকোর্স ধর্মপুর, নজরুল এভিনিউসহ অধিকাংশ প্রধান প্রধান সড়ক ডুবে যায়। একদা ব্যাংক ও ট্যাঙ্কের শহর কুমিল্লায় ব্যাংকের সংখ্যা বাড়লেও প্রতিনিয়ত কমছে ট্যাঙ্ক বা পুকুর। এতে জলাধার কমায় বৃষ্টির পানিতে বিগত প্রায় দুই দশক ধরে কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আসছে।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, বিগত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন সংস্থার অর্থায়নে প্রায় ১০০০ কোটি টাকার রাস্তাঘাট ও ড্রেনের কাজ হয়। নগরীর শাসনগাছা, রেসকোর্স, বাগিচাগাঁও, ফায়ার সার্ভিস রোড, কান্দিরপাড় নজরুল অ্যাভিনিউ, রানীরবাজার, অশোকতলা, স্টেশন রোড, পুলিশ লাইন, জেল রোড, ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়, ঝাউতলা, বাদুরতলা, মনোহরপুর, সার্কিট হাউজ রোড, আদালতের মোড়, তালপুকুর রোড,

ফয়জুন্নেসা স্কুল রোড, ডাক্তার পাড়া, সদর হাসপাতাল রোড, ছাতিপট্টি, রাজগঞ্জ, মোগলটুলীসহ প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জলাবদ্ধতা নিরশনে সিটি করপোরেশন বক্স ড্রেন নির্মাণ করলেও অজ্ঞাত কারণে এসব ড্রেন পানি নিষ্কাশনে কোনো কাজে আসছে না। অভিযোগ রয়েছে, সিটি করপোরেশনের সুষ্ঠু তদারকির অভাবে এসব ড্রেন অনেক স্থানেই অসমাপ্ত পড়ে রয়েছে।

কুমিল্লা নগরীতে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন মনির হোসেন । পুলিশ এলাকায় রিকশাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, পুলিশ লাইন এলাকায় অটোরিকশাটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাটারি অকেজো হয়ে গেছে । এখন এটি মেরামত করতে আমার ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকা লাগবে । আর যদি ব্যাটারির সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে ১৫০০০ থেকে ২০০০০ হাজার টাকা লাগবে। একটু বৃষ্টি হলেই এই এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।

কুমিল্লা নগরীর রেইসকোর্স এলাকার বাসিন্দা আবু বকর সিদ্দিক শিল্পী বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যেখানে-সেখানে বাড়ির নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখার কারণে পানির নিষ্কাশন হচ্ছে না ।‌ এজন্য কুমিল্লা সিটি করপোরেশনকে কঠোর হতে হবে । না হলে অদূর ভবিষ্যতে কুমিল্লা নগরীর মানুষকে বর্ষায় পানির নিচে বাস করতে হবে ।

নগরীর বেশিরভাগ সড়ক হাঁটু পানি, জলাবদ্ধতার জন্য কারা দায়ী এই বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, গত ১৪ বছর কুমিল্লা সিটি করপোরেশন উন্নয়নের নামে লুটপাট হয়েছে । জলাবদ্ধতা নিরসনে তারা কার্যকর কোনো কার্যক্রম করেনি । আমি গত মাসে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি। ইতিমধ্যে নগরীর রেইসকোর্স খাল এবং কান্দিরপাড় খাল খনন সম্পন্ন করেছি । যে সব জায়গায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে সেসব এলাকায় চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরো বলেন , নগরীর বেশির ভাগ ভবনের মালিকরা ড্রেনের ওপরে নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখার কারণে ড্রেন দিয়ে পানি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে ।‌

কুমিল্লা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা সৈয়দ আরিফুল রহমান আমার দেশ কে বলেন, মঙ্গলবার সকালে কুমিল্লায় ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে । আরো বৃষ্টি হতে পারে ।

নগরের বিশিষ্টজনরা জানান, বর্ষা আসলেই কুমিল্লা নগরী পানিতে তলিয়ে যায় । এটার জন্য সিটি করপোরেশনের সাবেক দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বা কর্তা ব্যক্তিরা দায়ী । অতীতে সিটি করপোরেশনে শত শত কোটি টাকার কাজ হয়েছে কিন্তু ফলাফল শূন্য ।‌ এজন্য যারাই বর্তমানে দায়িত্বে আছেন বা আসবেন পরিকল্পিতভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হবে ।‌

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন