মিরসরাইয়ে গৃহায়ণের ৪২ কোটি টাকার প্রকল্প, অনিয়মে ১০ বছরেও মেলেনি প্লট

মিরসরাইয়ে গৃহায়ণের ৪২ কোটি টাকার প্রকল্প, অনিয়মে ১০ বছরেও মেলেনি প্লট
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সোনাপাহাড় হাউজিং এস্টেট প্রকল্পের মূল ফটক। দীর্ঘ দিন ধরে প্রকল্পের ভেতরে ঝোপজঙ্গল ও জনমানবহীন পরিবেশ

স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসনের স্বপ্নপূরণে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে প্রায় একই সময়ে দুটি আবাসন প্রকল্প হাতে নিয়েছিল জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ (জাগৃক)। এর মধ্যে একটি সোনাপাহাড়ে, অন্যটি কিছমত জাফরাবাদে। তবে দীর্ঘ এক দশকেও সফলতার মুখ দেখেনি কোনোটিই। অনিয়ম, আত্মসাৎ, মামলা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভেস্তে যেতে বসেছে দুই আবাসন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞাপন

উপজেলার ১৬ দশমিক ২৮ একর জমির ওপর বাস্তবায়নাধীন ‘কিছমত জাফরাবাদ’ আবাসন প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৪২ কোটি ৩৭ লাখ ২১ হাজার টাকা। ১৬৩টি আবাসিক ও ৪টি বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দ দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হলেও প্রায় ১০ বছরেও উন্নয়নকাজ শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে প্লট বুঝে পাননি কোনো গ্রাহক।

তদন্তে জানা গেছে, প্রকল্পে মাটি ভরাটের কাজে ভয়াবহ অনিয়ম করা হয়েছে। ৮৭ হাজার ৯৩ ঘনমিটার মাটি ভরাট দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হলেও দুদকের নিরপেক্ষ প্রকৌশলীদের পরিমাপে পাওয়া যায় মাত্র ৪৩ হাজার ১২৯ ঘনমিটার। অসত্য তথ্য দিয়ে ৪৮ লাখ ৭৭ হাজার ৮৯৪ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় (চট্টগ্রাম-২) মামলা দায়ের করে।

এতে জাগৃকের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদ, সাবেক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. অলিউল ইসলাম, উপসহকারী প্রকৌশলী আশ্রাফুজ্জামান ও ঠিকাদার মাঈনুল কবিরকে আসামি করা হয়। বর্তমানে মামলাটি জেলা স্পেশাল জজ আদালতে বিচারাধীন।

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় (চট্টগ্রাম-২)-এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন জানান, তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী দুই মাসের মধ্যে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। তবে তদন্ত কর্মকর্তা

উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল হাসান অভিযোগ করেছেন, বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও জাগৃক নথিপত্র সরবরাহ না করায় তদন্ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও আসামি প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদ ও আশ্রাফুজ্জামান তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।

দীর্ঘ স্থবিরতার পর কিছমত জাফরাবাদ প্রকল্পটি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ১৮ কোটি টাকার নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলেও ঠিকাদারদের শর্ত অপূরণীয় থাকায় পুনরায় দরপত্র আহ্বানের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানান জাগৃক চট্টগ্রাম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলাম।

অন্যদিকে, ১৬.৪৮ একরের ‘সোনাপাহাড়’ প্রকল্পে ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণ শেষে ২০১৭ সালেই ১৮৩ জন গ্রাহকের কাছে প্লটের দলিল হস্তান্তর করা হয়। তবে দীর্ঘ নয় বছরেও সেখানে কোনো বসতি গড়ে ওঠেনি। তদারকির অভাবে সীমানা প্রাচীরে ঘেরা ১৬৩টি খালি প্লট এখন মাদকসেবী ও অপকর্মের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। ঘন ঝোপজঙ্গলে সাপের উপদ্রব বাড়ার পাশাপাশি প্রকল্পের শত শত বৈদ্যুতিক খুঁটির তার চোরেরা খুলে নিয়ে গেছে।

সোনাপাহাড় হাউজিং এস্টেট প্লট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল আবছার বলেন, বাউন্ডারি দেয়াল থাকলেও নিরাপত্তা নেই। বিদ্যুতের তার চুরি হয়ে গেছে, বারবার বললেও গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ মামলা করেনি। এখানে স্থায়ী আনসার ক্যাম্প ও সমন্বিত নজরদারি না থাকলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বসবাস শুরু করা সম্ভব নয়।

কিছমত জাফরাবাদ প্রকল্পের ভুক্তভোগী প্লট মালিক নাছির উদ্দীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ১০ বছর আগে জমানো টাকা দিয়ে প্লট কিনেছিলাম। আজ আমাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ আমাদের স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য নুরুল আমিন বলেন, স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসনের লক্ষ্যে প্রকল্প দুটি গ্রহণ করা হয়েছিল। কিছমত জাফরাবাদে কেন দীর্ঘদিন মাটি ভরাট হয়নি আর সোনাপাহাড়েই বা কেন বসতি গড়ে ওঠেনি, তা খতিয়ে দেখে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...