চট্টগ্রামের ১৫টি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের সম্পদের পরিমাণ অন্যদের চেয়ে বেশি। আবার শিক্ষাদিক্ষায় এগিয়ে আছেন জামায়াতে ইসলামীর নমিনিরা। এমনকি দাঁড়িপাল্লার কান্ডারিদের মধ্যে চিকিৎসকও বেশি। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থিদের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
হলফনামায় দেখা গেছে, বিএনপির প্রার্থীরা আয়, সম্পদ, নগদ অর্থের পরিমাণে জামায়াতের তুলনায় ১০-১২ গুণ পর্যন্ত এগিয়ে। বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থীদের অধিকাংশই আয়ের জন্য চাকরির ওপর নির্ভরশীল, পেশাদার সেবা, টিউশন কিংবা ছোট ব্যবসার মতো সীমিত উৎসের ওপর। তবে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিচারে জামায়াত প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসক, মাস্টার্স, এমফিল ও ইসলামিক শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রিধারীর সংখ্যা এখানে বেশি।
চট্টগ্রাম–১ (মিরসরাই) আসনে বিএনপির নুরুল আমিন হলফনামায় বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ২৩ লাখ টাকার বেশি। নগদ অর্থ আছে ১০ লাখ টাকা, আর স্থাবর–অস্থাবর মিলিয়ে তার মোট সম্পদ ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বেশি। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে তিনি ফাজিল পাস উল্লেখ করেছেন।
অপরদিকে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ ছাইফুর রহমানের বার্ষিক আয় প্রায় ১১ লাখ টাকা। নগদ অর্থ প্রায় ১৭ লাখ টাকা। মোট সম্পদ ৬০ লাখ টাকার বেশি। কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতায় তিনি অনেক এগিয়ে এমএ, এলএলবি।
চট্টগ্রাম–২(ফটিকছড়ি) আসনে বিএনপির সরোয়ার আলমগীর বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৫৭ লাখ টাকার বেশি। নগদ অর্থ ৩ লাখ, আর সম্পদ ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বেশি। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে তিনি স্ব–শিক্ষিত উল্লেখ করেছেন। জামায়াতের মোহাম্মদ নুরুল আমিনের বার্ষিক আয় প্রায় ১১ লাখ টাকা। সম্পদের পরিমাণ ১৩ কোটি টাকা, যা এই আসনে সবার চেয়ে বেশি। শিক্ষাগত যোগ্যতা ফাজিল পাস।
চট্টগ্রাম–৩ (সন্দ্বীপ) আসনে বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশার বার্ষিক আয় ৫৭ লাখ টাকার বেশি, নগদ অর্থ ৩ লাখ এবং সম্পদ ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বেশি। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পাস। অপরদিকে জামায়াতের মুহাম্মদ আলা উদ্দীন বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন সাড়ে ৪ লাখ টাকা। তার নগদ অর্থ ৭৭ হাজার। সম্পদ দেড় ১ কোটি টাকার বেশি। শিক্ষাগত যোগ্যতা তিনি এমএসএস পাস।
চট্টগ্রাম–৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরী সম্পদ দেখিয়েছেন ৪৫৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। তবে তার ঋণ আছে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যা নিজের সম্পদের প্রায় পৌনে চার গুণ। হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন, এসব ঋণের বড় অংশই এসেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জামিনদার ও পরিচালক থাকার কারণে। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে তিনি হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে এমকম পাস।
অন্যদিকে একই আসনে জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিকীর আর্থিক অবস্থা মোটামুটি সাধারণের পর্যায়ে। তার বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, নগদ অর্থ মাত্র ৯০ হাজার এবং মোট সম্পদ প্রায় ৪৪ লাখ টাকা। তিনি ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স পাস।
চট্টগ্রাম–৫ (হাটহাজারী) আসনে জোটগত সমঝোতার কারণে জামায়াত প্রার্থী দেয়নি। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে আছেন বিএনপির মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ও শাকিলা ফারজানা, ইসলামী আন্দোলনের মতি উল্লাহ নূরী, খেলাফত মজলিসের নাসির উদ্দীন। বিএনপির মীর হেলাল তার হলফনামায় মোট সম্পদ দেখিয়েছেন ১৩ কোটি টাকা, আর তার স্ত্রীর নামে আছে ২০ লাখ। নগদ অর্থ শুধু তার কাছেই ৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, স্ত্রীর নগদ অর্থ আরও ২০ লাখ। বার্ষিক আয় প্রায় ৩০ লাখ টাকা। মীর হেলাল এলএলবি ডিগ্রিধারী।
চট্টগ্রাম–৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতা-গোলাম আকবর খন্দকার ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী-সম্পদের পরিমাণ নিয়ে আলোচনায় আছেন। আকবর নিজের নামে ৩৬ কোটি এবং স্ত্রীর নামে আরও ১৬ কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। বার্ষিক আয় ১৬ লাখ; নগদ অর্থ আছে ১ কোটি ২২ লাখ, আর তার স্ত্রীর নগদ অর্থ ১ কোটি ৮২ লাখ। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স।
গিয়াস কাদেরের সম্পদ ২৬ কোটি টাকা, স্ত্রীর সম্পদ ১৬ কোটি। তবে তার বার্ষিক আয় সবচেয়ে বেশি ৩১ কোটি টাকার মতো। নগদ অর্থ তার নিজের কাছে ১ কোটি ৭৫ লাখ, স্ত্রী–এর কাছে ৯ কোটি ২৮ লাখ। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ (অনার্স)।
অপরদিকে জামায়াতের প্রার্থী শাহজাহান মঞ্জু আর্থিকভাবে তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে। তার বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা, হাতে কোনো নগদ অর্থ নেই। সম্পদ মাত্র ৮১ লাখ টাকা। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে তিনি এসএসসি পাস দেখিয়েছেন।
চট্টগ্রাম ৭-১৬ আসনে সম্পদ–শিক্ষায় ব্যাপক ব্যবধান
চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় বেল্ট রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী–চান্দগাঁও, কোতোয়ালী, ডবলমুরিং, পতেঙ্গা, পটিয়া, আনোয়ারা–কর্ণফুলী, সাতকানিয়া–লোহাগাড়া ও বাঁশখালী-এই ৯টি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের আয়–সম্পদ–শিক্ষাগত যোগ্যতায় চোখে পড়ার মতো বৈসাদৃশ্য দেখা গেছে।
চট্টগ্রাম-৭ আসনে বিএনপির হুম্মাম কাদের চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামানজার শ্যামা তার চেয়েও সম্পদশালী। তার স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ হুম্মামের ৫২ গুণ। একই সঙ্গে স্ত্রীর আয়ও স্বামীর তিনগুণ বেশি। বিএনপির হুম্মাম কাদের বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৫৯ লাখ টাকা। স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ ৪৩ কোটি টাকার বেশি। যা পুরো আসনে সবচেয়ে আলোচিত সংখ্যা। হুম্মাম কাদের নিজেকে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত দেখিয়েছেন।
জামায়াতের এটিএম রেজাউল করিম বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৩৮ লাখ টাকা। তার নগদ অর্থ ৮ লাখ, স্ত্রীর ১৯ লাখ টাকা। তার সম্পদ আছে ৪ কোটি ৭০ লাখ, স্ত্রীর ২ কোটি ৪৪ লাখ। তিনি এমবিবিএস ডাক্তার।
চট্টগ্রাম–৮ আসনে বিএনপির এরশাদ উল্লাহর সম্পদ ২৪ কোটি টাকা, স্ত্রীর ১১ কোটি। বার্ষিক আয় ৪৪ লাখ টাকা, নগদ অর্থ ২ কোটি ৩৩ লাখ, স্ত্রীর নগদ অর্থ ৩ কোটি ২৬ লাখ। তিনি ব্যাচেলর অব আর্টস। জামায়াতের আবু নাছের বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৪৮ লাখ টাকা। তার নগদ অর্থ ৩৭ লাখ, সম্পদ আড়াই কোটি টাকার বেশি। স্ত্রীর সম্পদ আছে ৭৬ লাখ টাকা। তিনিও এমবিবিএস ডাক্তার।
চট্টগ্রাম–৯ আসনে বিএনপির মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান সম্পদ দেখিয়েছেন ৪ কোটি ৩৮ লাখ, স্ত্রীর নামে প্রায় ৩ কোটি। নগদ অর্থ ৮৭ লাখ, স্ত্রীর ৫২ লাখ। তার বার্ষিক আয় ৮ লাখ টাকা। শিক্ষাগত যোগ্যতা কামিল পাস। অপরদিকে জামায়াতের ডা. এ কে এম ফজলুল হক বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১৯ লাখ টাকা। তার নগদ অর্থ ১৭ লাখ এবং সম্পদ ৮ কোটি টাকার মতো। তিনি এমবিবিএস ডাক্তার।
চট্টগ্রাম–১০ আসনে বিএনপির সাঈদ আল নোমান নগদ অর্থ দেখিয়েছেন ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। দুই স্ত্রী-সাজিয়া আবদুল্লাহ ও ফাজিলাতুন নেসা সূচীর কাছে নগদ আছে ১ কোটি ১৮ লাখ। সম্পদ ৩৫ কোটি টাকা। বার্ষিক আয় ১ কোটি ২ লাখ টাকার বেশি। তিনি এমফিল। অপরদিকে জামায়াতের মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১০ লাখ। তার নগদ অর্থ ২ লাখ, সম্পদ দেড় কোটি টাকার বেশি। স্ত্রীর সম্পদ ২০ ভরি স্বর্ণ। তিনি স্নাতকোত্তর।
চট্টগ্রাম–১১ আসনে বিএনপির আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্পদ দেখিয়েছেন ১৫ কোটি টাকা, স্ত্রীর সম্পদ ৬ কোটি টাকা। নগদ অর্থ তার নিজের ১ কোটি ৮৭ লাখ, স্ত্রীর ১ কোটি ৩২ লাখ। বার্ষিক আয় ১ কোটি ৬০ লাখ। তিনি বিএ পাস।
জামায়াতের মোহাম্মদ শফিউল আলম বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১৪ লাখ টাকার বেশি। নগদ অর্থ ২৭ লাখ টাকা। তার সম্পদ ১০৯ কোটি টাকার বেশি, যা এ আসনে সর্বোচ্চ। শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএসসি (মেরিন সায়েন্স)।
চট্টগ্রাম–১২ আসনে বিএনপির মোহাম্মদ এনামুল হক নগদ অর্থ দেখিয়েছেন ১ কোটি ৬ লাখ টাকা। বার্ষিক আয় ৮৮ লাখ টাকার বেশি। সম্পদ ৪৪ কোটি ৫৯ লাখ, স্ত্রীর ২ কোটি ৩১ লাখ। তিনি এইচএসসি পাস। জামায়াতের মোহাম্মদ ফরিদুল আলমের বার্ষিক আয় ১৬ লাখ টাকার বেশি। তার নগদ অর্থ ৩ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার এবং সম্পদ ১২ কোটি ১৫ লাখ, স্ত্রীর ২ কোটি। তিনি এমবিবিএস ডাক্তার।
চট্টগ্রাম–১৩ আসনে বিএনপির সরোয়ার জামাল নিজামের বার্ষিক আয় ৩৩ লাখ, নগদ অর্থ ৩৭ লাখ টাকা। তার স্ত্রীর নগদ অর্থ মাত্র ১৮ হাজার টাকা। তার সম্পদ ৬ কোটি টাকার বেশি, স্ত্রীর ৯ কোটি টাকার বেশি। তিনি স্নাতক পাস। অপরদিকে জামায়াতের মাহমুদুল হাসান বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন মাত্র ৫০ হাজার টাকা। তার নগদ অর্থ ৮২ হাজার, সম্পদ ৬৫ লাখ। তিনি মাস্টার্স পাস।
চট্টগ্রাম–১৪ আসনে বিএনপির জসিম উদ্দীন আহমেদ নগদ অর্থ দেখিয়েছেন ১৫ কোটি ১ লাখ, স্ত্রীর ১৪ লাখ টাকা। বার্ষিক আয় ২ কোটি ৪২ লাখ টাকার বেশি। তার সম্পদ প্রায় সাড়ে ৪০ কোটি টাকা। তিনি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত।
জামায়াত এখানে সমঝোতার ভিত্তিতে এলডিপির ওমর ফারুককে প্রার্থী করেছে। তিনি বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১ কোটি টাকার বেশি। নগদ অর্থ তার ৬৯ লাখ, স্ত্রীর ৩৫ লাখ টাকা। সম্পদ তার ৩ কোটি ১৬ লাখ, স্ত্রীর ৫ কোটি ৬০ লাখ।
চট্টগ্রাম–১৫ আসনে জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী সম্পদ দেখিয়েছেন ২ কোটি ৪০ লাখ, নগদ অর্থ ১ কোটি ৩৪ লাখ, স্ত্রীর ২৮ লাখ। তার বার্ষিক আয় ১০ লাখ টাকার মতো। তিনি এলএলবি পাস। অপরদিকে বিএনপির নাজমুল মোস্তফা আমিন হলফনামায় উল্লেখ করেছেন তিনি বিএ পাস।
চট্টগ্রাম–১৬ আসনে বিএনপির মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী নগদ অর্থ দেখিয়েছেন ২০ লাখ, স্ত্রীর ১৮ লাখ। তার সম্পদ ১৩ কোটি ৪০ লাখ, স্ত্রীর ৪৮ লাখ। বার্ষিক আয় ১৯ লাখ। তিনি ও-লেভেল পর্যন্ত পড়েছেন। জামায়াতের মুহাম্মদ জহিরুল ইসলামের নগদ অর্থ ৭ লাখ, স্ত্রীর ১০ লাখ টাকা। তার সম্পদ ১ কোটি ২৭ লাখ, স্ত্রীর ৮০ লাখ। বার্ষিক আয় মাত্র ২ লাখ। জহিরুল এমএল, বিএ অনার্স।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


চট্টগ্রামে জামায়াতসহ ৮ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র নতুন উত্তেজনা
ভেনেজুয়েলায় বিনা মূল্যে ইন্টারনেট চালু করছেন ইলন মাস্ক