হেঁটে গিয়েছিল হাসপাতালে, তিন ঘণ্টা পর ফিরল লাশ হয়ে

হেঁটে গিয়েছিল হাসপাতালে, তিন ঘণ্টা পর ফিরল লাশ হয়ে

হেঁটে গিয়েছিল সে, নিজের পায়ে। সিঁড়িও বেয়েছে। বাবা-মায়ের চোখে ছিল একটাই প্রার্থনা, মেয়ে যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে। কিন্তু ঠিক তিন ঘণ্টা পর, হাসপাতালের সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসে মেয়েটি, শুধু নিথর দেহ হয়ে।

চট্টগ্রাম নগরের আসকার দীঘির পাড়ে নিউ লাইফ হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ঘটে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। নিহত কিশোরীর নাম প্রজ্ঞা নন্দী (১৫)। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল সে।

বিজ্ঞাপন

পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসাতেই মৃত্যু হয়েছে কিশোরী প্রজ্ঞার। তার বাবা পলাশ কুসুম নন্দী এ বিষয়ে তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে নালিশি মামলা করেছেন।

সোমবার (২৩ জুন) মামলাটি দায়ের করা হয় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিকের আদালতে। আদালত অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)কে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বাদীর আইনজীবী পার্থ প্রতীম নন্দী বলেন, আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, প্রজ্ঞা দীর্ঘদিন ধরে মাইগ্রেনে ভুগছিল। গত ২ জুন হঠাৎ বমি ও দুর্বলতা শুরু হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে নিউ লাইফ হসপিটালে নিয়ে যান। কর্তব্যরত চিকিৎসক তখন পরীক্ষা না করেই জানান, ভর্তি লাগবে না, কেবল স্যালাইন দিলেই হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রজ্ঞাকে স্যালাইন দেয়া হয়। এরপর কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ইনজেকশন পুশ করা হয় ক্যানোলার মাধ্যমে। ২০ মিনিটের মধ্যেই মেয়েটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তৎক্ষণাৎ কোনো বিশেষজ্ঞ ডাকা হয়নি। বারবার অনুরোধ করার পরও হাসপাতালের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘সময় লাগবে।’ একপর্যায়ে বিকেলে প্রজ্ঞাকে ভর্তি করা হলেও অবস্থার উন্নতি না হওয়া সত্ত্বেও রাত ১০টার দিকে দেয়া হয় ছাড়পত্র। এরপর দ্রুত অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, মেয়েটি অনেক আগেই মারা গেছে।

নিউ লাইফ হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আমার মেয়ে হেঁটে হাসপাতালে ঢুকেছিল, আর বের হলো লাশ হয়ে...আমার দেশকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন প্রজ্ঞার বাবা পলাশ কুসুম নন্দী।

তিনি বলেন, একটু দুর্বলতা হয়েছিল প্রজ্ঞার। মাইগ্রেনের সমস্যা ছিল আগে থেকেই। ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম চিকিৎসকের কাছে, ভেবেছিলাম সামান্য স্যালাইন দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু যে চিকিৎসকের ওপর ভরসা করে আমরা মেয়েকে ওখানে নিয়ে গিয়েছিলাম, তারা বললেন ভয়ের কিছু নেই, ভর্তি লাগবে না। এরপরই ইনজেকশন দিল। ঠিক ২০ মিনিটের মধ্যেই মেয়েটা চোখ বন্ধ করে ফেলে।

আমি চিৎকার করছিলাম, ডাক্তার ডাকতে বলছিলাম, ওর মা কাঁদছিল, কিন্তু কেউ আসল না।

বুক ভেঙে আসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পলাশ বলেন, আমি বারবার বলেছিলাম, অন্তত একজন বিশেষজ্ঞ ডাকেন। আমার মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে গেছে। তারা বলছিল, সময় লাগবে। পরে যখন ভর্তি করল, তখনও কিছু করল না। আর রাত ১০টায় বলে, নিয়ে যান। আরেক হাসপাতালে নিয়ে গেছি। তারা বলল, আপনার মেয়ে তো আগেই মারা গেছে। কী বলব আপনাকে ভাই, আমি তো শুধু ওর হাত ধরেই ছিলাম।

থেমে থেমে কাঁপা কণ্ঠে তিনি বললেন, একটু যদি সচেতন হতো, একটু যদি আগেই ব্যবস্থা নিত, আমার মেয়ে আজো বেঁচে থাকত। আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারি না এখন। আমার মেয়েকে মেরে ফেলেছে ওরা, একটুও দয়া হলো না।

এমএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন