চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ড পৌরসভায় প্রায় ৯ কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকে ঘিরে টেন্ডারজট, প্রকল্প পরিকল্পনায় অসঙ্গতি, ভুল সড়কে খনন ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ উঠেছে। এতে তীব্র জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ দীর্ঘদিনেও শুরু না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন না হলে কোটি কোটি টাকার আন্তর্জাতিক বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভুলবশত খনন করে ফেলে রাখা প্রায় ৫০০ ফুট ইটের সোলিং সড়কটি এখন বড় বড় গর্ত, কাদা ও জলাবদ্ধতায় পরিণত হয়েছে। টানা বর্ষণে সড়কটি সম্পূর্ণ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল প্রায় বন্ধের উপক্রম। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন নারী, শিশু ও বয়স্করা। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদরাসায় যাতায়াতও ব্যাহত হচ্ছে। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চৌধুরীপাড়া-রেলওয়ে কানেক্টিং সড়কের উন্নয়নকাজের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হলেও বাস্তবে আব্দুর রব চৌধুরী সড়কে খননকাজ শুরু করা হয়। এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে কাজ বন্ধ হয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কটি আর সংস্কার করা হয়নি।
পৌরসভা বিএনপির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া আমার দেশকে বলেন, টেন্ডারের আগে প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে যাচাই করা হলে এমন ভুল হওয়ার সুযোগ ছিল না। একটি সচল সড়ক অকারণে কেটে ফেলে হাজারো মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা হয়েছে। প্রকৌশল বিভাগের পরিকল্পনা ও তদারকির ঘাটতিই এ পরিস্থিতির মূল কারণ।
পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর শামসুল আলম আজাদ আমার দেশকে বলেন, কার্যাদেশ দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দায়িত্ব ছিল সরেজমিনে গিয়ে ঠিকাদারকে প্রকল্পের সঠিক স্থান বুঝিয়ে দেওয়া। সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করায় ভুল সড়কে কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এমজিএসটি ও আরইউটিডিপি প্রকল্পের আওতায় ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শেখপাড়া পুরাতন সড়ক, পোল্ট্রি ফার্ম কানেক্টিং রোড এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আমির হোসেন মিয়াজী বাড়ি সড়কের কার্যাদেশ প্রায় এক বছর আগে দেওয়া হলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ না হলে কোটি কোটি টাকার আন্তর্জাতিক অর্থায়ন হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
ভূঁইয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ডাক্তার ফারুক আমার দেশকে বলেন, এখন এমন অবস্থা হয়েছে, কেউ মারা গেলে লাশ বের করার মতো রাস্তা নেই। গুরুতর কোনো রোগীকে হাসপাতালে নিতে অ্যাম্বুলেন্সও গ্রামে ঢুকতে পারবে না। গ্রামের মানুষ এক বস্তা চাল নিয়েও ঘরে ফিরতে পারছেন না। একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে পুরো গ্রামের মানুষকে সীমাহীন কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে শিশু ও বয়স্কদের চলাচল সবচেয়ে বেশি দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি নাছির উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, ৩০ জুন পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুন্নবী ও সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইউসুফ সরেজমিনে গিয়ে মৌলভীপাড়ার ইউসুফ আলী মসজিদসংলগ্ন সড়কটি উন্নয়নকাজের স্থান হিসেবে দেখিয়ে দেন। পরে তাদের টেলিফোনে দেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু দাপ্তরিক ভুল সামনে আসার পর প্রকৌশল বিভাগ এখন পুরো দায় ঠিকাদারের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে।
তবে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইউসুফ আমার দেশকে বলেন, ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। একটি সচল সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। পৌরসভার কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু না করায় সামগ্রিকভাবে উন্নয়নকাজে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌরসভার প্রশাসক আমার দেশকে বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৌশল বিভাগের গাফিলতি বা ভুল নির্দেশনার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ শুরু না করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে কার্যাদেশ বাতিল করে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুন্নবীর সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

