:: গণদলের ভাইস চেয়ারম্যান পরিচয়ে আবেদন, ঢাকার ঠিকানা যাচাইয়ের পরই মেলে যমুনার আমন্ত্রণ
:: কামালের পরিচয় চট্টগ্রাম থেকে যাচাই হয়নি, দাবি সিএমপি কমিশনারের
:: চট্টগ্রামের মতামত নিলে সৈনিক লীগ নেতা যমুনায় যাওয়ার সুযোগ পেতেন না, বললেন ডা. শাহাদাত
:: কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের নেতার যমুনায় উপস্থিতি নিয়ে তোলপাড়, প্রশ্ন নিরাপত্তা যাচাই নিয়েও
চট্টগ্রামে তিনি পরিচিত ছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের নেতা হিসেবে। কখনো পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), কখনো পুলিশ কমিশনার, কখনো ওসি, আবার কখনো বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতেন। নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তির গল্প শুনিয়ে প্রশাসনের অনেককেই প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন তিনি।
সেই মো. কামাল উদ্দিন, যিনি চট্টগ্রামে ‘বেকারি কামাল’ নামেও পরিচিত, এবার দেখা গেল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার করমর্দনের ছবি প্রকাশ্যে আসার পর নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরেও উঠেছে প্রশ্ন-কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একজন পরিচিত নেতা কীভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত অনুষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ পেলেন?
একাধিক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে খোঁজখবর শুরু হয়েছে। কীভাবে তিনি আমন্ত্রিত হলেন, কার সুপারিশে প্রবেশাধিকার পেলেন এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের কোন ধাপে এই বিষয়টি নজরে আসেনি-এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
'উচ্চ পর্যায়' থেকে আসত ফোন
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) একজন কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে বলেন, কামাল উদ্দিনকে নিয়ে মাঠ পর্যায় থেকে একাধিকবার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় প্রতিবারই উচ্চপর্যায় থেকে ফোন আসত।
ওই কর্মকর্তা বলেন, তার বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠানোর আগে বিভিন্ন উচ্চপর্যায় থেকে ফোন আসত। বলা হতো, ইতিবাচক রিপোর্ট দিতে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা যখন তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতেন, তখন তিনি কখনো পুলিশ কমিশনার, কখনো অন্য কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে ফোন করিয়ে দিতেন। এতে অনেক কর্মকর্তা বিব্রত হতেন।
আরেকটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, কামাল উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে তিনি নিজের প্রভাবের বার্তা দিতেন।
আমার দেশের হাতে আসা একটি নথিতে মো. কামাল উদ্দিন প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে যাওয়া্র জন্য নিজের পরিচয় দিয়েছেন 'গণদলের’ ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে। ওই নথিতে তার ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে স্বপনীড়, বাসা-৬, ফ্ল্যাট-৬ডি, রিভারভিউ আবাসিক এলাকা, রোড-১১, বাড়ৈইখালি, হাজারীবাগ, ঢাকা। ওই নথিটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়ার পর ঢাকা থেকে ভেরিফাই করে তাকে অনুষ্ঠানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী আমার দেশকে বলেন, তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাওয়ার জন্য যে ঠিকানা ব্যবহার করেছেন, সেটি ঢাকার ঠিকানা। এখান থেকে ভেরিফাই হয়নি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের স্টাফ অফিসার (এসও) বলেন, যমুনায় অনুষ্ঠিত ওই নৈশভোজের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ডিএমপি দায়িত্ব পালন করলেও অতিথি নির্বাচন বা আমন্ত্রণের বিষয়টি তাদের এখতিয়ারে ছিল না।
তিনি আমার দেশকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারাই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। অতিথিদের আমন্ত্রণ ও তালিকা তারাই প্রস্তুত করেছেন। মো. কামাল উদ্দিন কীভাবে বা কোন পরিচয়ে দাওয়াত পেয়েছেন, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারাই সঠিক তথ্য দিতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, ডিএমপি কেবল নিরাপত্তা সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করে। কে আমন্ত্রিত হবেন, সেটি আয়োজক কর্তৃপক্ষের বিষয়।
সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভার করে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স বা এসএসএফ। এই বিষয়ে জানতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাদের বক্তব্যও নেওয়া যায়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে ব্যাখা আসলে বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট হওয়া যাবে।
একাধিক পরিচয়ের আড়ালে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
চট্টগ্রামে কামাল উদ্দিনের পরিচয় শুধু সৈনিক লীগের নেতা হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজেকে সাংবাদিক, জাতীয় দৈনিকের উপ-সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদক, লেখক, টেলিভিশন উপস্থাপক, মানবাধিকার সংগঠনের নেতা কিংবা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পদধারী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তার ব্যবহৃত ভিজিটিং কার্ডেও বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় দেখা গেছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এই বহুমাত্রিক পরিচয় ব্যবহার করেই তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ তৈরি করেন এবং নিজের একটি গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র বলছে, ৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত কামাল উদ্দিন ছিলেন 'বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের’ চট্টগ্রাম মহানগরের আহ্বায়ক। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি কিছু সময়ের জন্য এই পদে ছিলেন। বিভিন্ন কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার ছবি ও ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রয়েছে।
তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের আফতাব কনকর্ড আবাসিক এলাকায় মদ্যপ অবস্থায় বাসিন্দাদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগে মামলাও হয়েছে। এছাড়া ঢাকার মতিঝিল থানায় ইয়াবা-সংক্রান্ত তালিকাভুক্তির অভিযোগও রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশংসায় ধারাবাহিক প্রচারণা
সরকার পরিবর্তনের পরও কামাল উদ্দিনের সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায় ভিন্ন ধরনের তৎপরতা। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত তিনি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে প্রশংসামূলক লেখা প্রকাশ করেন।
চলতি বছরের ১৭ মে চট্টগ্রাম জেলার এসপি মাসুদ আলমকে নিয়ে তিনি বিশদ একটি লেখা লিখেন। তিনি লেখেন, গণমুখী পুলিশ, নিরাপদ চট্টগ্রাম ও সাংবাদিকতার দায়: এসপি মাসুদ আলমের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে নির্ভীক গণমাধ্যমের ভূমিকা....
২ মে প্রকাশ করেন, সংবাদ, বিবেক ও সংশোধনের আলো-সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর মানবিক প্রশাসনিক দর্শন... ১৭ এপ্রিল লেখেন, চান্দগাঁও থেকে কোতোয়ালি-ওসি আফতাব উদ্দিনের উত্থান, সাফল্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতার গভীর পাঠ...১৩ এপ্রিল প্রকাশ করেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসানকে নিয়ে প্রশংসামূলক লেখা।
৪ এপ্রিল লেখেন, আলোকে ঘিরে অন্ধকারের অবরোধ হাসিব আজিজ, সিএমপির অগ্নিরত সময়ের এক অনমনীয় সত্যের ইতিহাস। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি, এপিবিএন ও বিভিন্ন ইউনিট নিয়েও তিনি প্রশংসাসূচক পোস্ট করেছেন। তবে তার সবগুলো লেখা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবই এআই দিয়ে লিখেছেন।
কামাল উদ্দিনের যমুনায় উপস্থিতির ছবি প্রকাশ হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, আওয়ামী লীগের একজন পরিচিত সুবিধাভোগী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি সংগঠনের নেতা যদি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে পৌঁছে যেতে পারেন, তাহলে নিরাপত্তা যাচাই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের নেতাকর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাই চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে স্থানীয় নেতৃত্বের ধারণা সবচেয়ে স্পষ্ট।
আমার দেশকে তিনি বলেন, যমুনার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আয়োজনে চট্টগ্রাম থেকে অতিথি নির্বাচন বা পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়ে আমাদের মতামত নেওয়া হলে অন্তত আওয়ামী লীগের পদধারী বা পরিচিত সুবিধাভোগী কেউ সেখানে পৌঁছাতে পারতেন না। আমরা সংশ্লিষ্টদের যথাযথ তথ্য দিতে পারতাম।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিচয় যাচাই আরও সতর্কতার সঙ্গে হওয়া উচিত। ভবিষ্যতে যাতে এমন বিতর্কের সৃষ্টি না হয়, সে জন্য আমন্ত্রণ ও নিরাপত্তা যাচাই উভয় প্রক্রিয়াই আরও সমন্বিত হওয়া প্রয়োজন।
গোয়েন্দা সংস্থার সামনে বড় প্রশ্ন
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে আয়োজিত যেকোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় ও পটভূমি একাধিক ধাপে যাচাই হওয়ার কথা।
সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একজন পরিচিত নেতার সেখানে পৌঁছানোর সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো-এখন সেটিই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, কামাল উদ্দিনের যমুনায় উপস্থিতির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলছেন, যাকে এতদিন আওয়ামী লীগের সক্রিয় মুখ হিসেবে সবাই চিনতেন, তিনি কীভাবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেন। প্রশাসনের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে নীরব অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার বিকেলে মো. কামাল উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, তিনি একটি বিবৃতি পাঠাবেন, সেখানে বিস্তারিত বলবেন। তবে এর আগে তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি নিজের অতীত রাজনৈতিক অবস্থানকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
তবে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ, 'বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ'-এর পদধারী হিসেবে পরিচয় ব্যবহার, শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে প্রশংসামূলক বক্তব্য ও শুভেচ্ছাবার্তা প্রকাশ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগের অবস্থানের পক্ষে রাজপথে সক্রিয় থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সেগুলো অস্বীকার করেননি।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

