মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় কমছে রপ্তানি, রাজস্ব আদায়ে শঙ্কা

সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় কমছে রপ্তানি, রাজস্ব আদায়ে শঙ্কা

ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটায় এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। এতে রাজস্ব আদায় ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলেও শেষ প্রান্তিকে এসে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। আমদানিকারকরা আতঙ্কে আছেন মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে আর বিদেশি বায়াররা চাচ্ছেন জ্বালানি তেল বিপণনের রাষ্ট্রীয় রূপরেখা বা নিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে দুই খাতেই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম বন্দরের গত ১০ বছরের পরিসংখ্যান বলছে, কন্টেইনার ও খোলা পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে দুই ক্ষেত্রেই গড়ে ১০ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। সাধারণত অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে স্বাভাবিক গতিধারা থাকলেও শেষ তিন মাসে সবচেয়ে বেশি আমদানি ও রপ্তানি হয়ে থাকে। তবে চলতি অর্থবছরের শেষ সময়টি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে কাটছে অস্থিরতার মধ্যে।

বন্দর সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ২৫ লাখ ৭৪ হাজার টিইইউ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে খোলা পণ্য (বাল্ক কার্গো) হ্যান্ডলিং হয়েছে ১০ কোটি ৪৩ লাখ টন, প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় জাহাজ এসেছে তিন হাজার ২৩০টি। আগের বছর জাহাজ আসা যাওয়াতেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ।

গত ১০ বছরের পরিসংখ্যন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রতি বছর কন্টেইনারে ছয় থেকে সাত, কার্গোতে ১১ থেকে ১২ ও জাহাজ আসা-যাওয়াতে ১০ থেকে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু এবার প্রবৃদ্ধির গতি থমকে গেছে। কারণ ক্যালেন্ডার বছরের শুরুতে আর অর্থবছরের শেষে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে কমতে শুরু করেছে আমদানি-রপ্তানি দুটোই। তবে বেশি আঘাত এসেছে রপ্তানি বাণিজ্যে।

চট্টগ্রাম বন্দর বলছে, চলতি ক্যালেন্ডার বছরের শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করেছে রপ্তানি বাণিজ্য। গত জানুয়ারিতে রপ্তানি পণ্যবাহী কন্টেইনার জাহাজীকরণ হয়েছে ৭৯ হাজার টিইইউ। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা আরো কমে রপ্তানি হয়েছে ৬২ হাজার টিইইউ আর মার্চে রপ্তানিতে রীতিমতো ধস নেমেছে। ৩১ দিনের এ মাসে রপ্তানি পণ্যবাহী কন্টেইনার জাহাজীকরণ হয়েছে মাত্র ৬০ হাজার টিইইউ, অর্থাৎ প্রতি মাসেই ধারাবাহিকভাবে কমেছে রপ্তানির পরিমাণ। রপ্তানি কমলে স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পাবে আমদানি। কারণ রপ্তানি পণ্যের অধিকাংশ কাঁচামালই আমদানিনির্ভর। এর ওপর দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি সংকটে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উৎপাদনও।

চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (হারবার অ্যান্ড মেরিন) কমোডর আমিন আহমেদ আব্দুল্লাহ জানান, বৈশ্বিক এ সংকটের মধ্যেও ১০ কোটি ৪২ লাখ মেট্রিক টন কার্গো পণ্য হ্যান্ডলিং করে ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ২৫ লাখ ৭৪ হাজার কন্টেইনারে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং তিন হাজার ২৩০টি জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে একমাত্র বন্দরের দক্ষ নেতৃত্বের কারণে। গত বছর ৩২ লাখ ৯৬ হাজার কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল। এ বছর ৩৪ লাখ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করার টার্গেট ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে কিছুটা ঝুঁকি তৈরি হলেও এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে বছর শেষে ৩৩ লাখ ৫০ হাজার কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

একই চিত্র চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব খাতেও। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এককভাবে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫৮ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৫ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা আদায় করে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল এক লাখ কোটি টাকা। কিন্তু প্রথম ৯ মাসে আদায় হয়েছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় গত বছরের অর্জনের কাছাকাছি যাওয়া কঠিন।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, যুদ্ধের কারণে মার্চ মাসে আমদানির পরিমাণ কিছুটা কমলেও উচ্চ শুল্কহারের জ্বালানি তেল-ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ও খাদ্যপণ্য আমদানি থেকে রাজস্ব আয়ের ধারা ঠিক রাখতে পারছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। মার্চ মাসেই এখানে রাজস্ব আদায় হয়েছে ছয় হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২৫০ কোটি টাকা বেশি। আর গত ৯ মাসে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হলেও ৫৮ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাস্টমস সক্রিয় আছে। যুদ্ধের প্রভাব কেটে গেলে পিছিয়ে পড়া লক্ষ্য দ্রুত সময়ের মধ্যে অর্জিত হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি ও ইস্টার্ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাছির উদ্দিন চৌধুরী জানান, করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ফের মধ্যপ্রাচ্য সংকট আমাদের সব পরিকল্পনা এলোমেলো করে দিয়েছে। এ যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে কত সময় টিকে থাকা যাবে সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি রপ্তানি বাজার কম থাকলেও জ্বালানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ বিষয়টি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বায়ারদেরও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন যেসব অর্ডার আসছে, তারা আগামী অন্তত চার মাসের জ্বালানি সরবরাহ ঠিক আছে কি নাÑজানতে চাচ্ছে। কেউ কেউ সরকারের জ্বালানি বিতরণের রূপরেখাও জানতে চাচ্ছে। কিন্তু আমাদের কাছে সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে যোগাযোগ করেও কোনো সুফল পাচ্ছি না। এ অবস্থায় নতুন অর্ডার পাওয়া ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগ্রুপ ও আমদানিকারক টিকে গ্রুপের ডিরেক্টর মোহাম্মদ মুস্তফা হায়দার জানান, পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে সংকট মোকাবিলার রূপরেখা নির্ধারণ করতে হবে সরকারকে। এখন দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্বালানি সংকট মোকাবিলার রূপরেখা নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের বিষয়টিও চিন্তা করতে হবে। তবে শুধু পরিকল্পনা করে থেমে থাকলে চলবে না, এর বাস্তবায়ন করতে হবে। এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনায় অনুকূল পরিবেশ নেই, তার ওপর এ যুদ্ধ নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই, তবে দেশের বাজারে প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা দিয়ে প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সেখানে সরকার কতটুকু মুন্সিয়ানা দেখাতে পারে সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...