খুলনার বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ১৫ মাস বিনা বেতনে কাজ করা দুই শতাধিক আউটসোর্সিং কর্মীর বকেয়া বেতন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তাদের সবাইকে আকস্মিক অব্যাহতির আদেশ দিয়েছেন খুলনার সিভিল সার্জন। এতে তীব্র ক্ষোভ ও হাসপাতালগুলোতে চরম অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়। বাধ্য হয়ে ঘটনার ছয় দিনের মাথায় পূর্বের সেই চিঠি প্রত্যাহার করে নেন সিভিল সার্জন। তবে এখনও বকেয়া বেতন হাতে না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন নিম্ন আয়ের এসব প্রান্তিক কর্মী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় খুলনার ১৭টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ২১৪ জন আউটসোর্সিং কর্মচারীর এক বছরের বেতনভাতা বাবদ ৫ কোটি ২ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ছাড় করে। কিন্তু এর ঠিক চার দিন পর, অর্থাৎ গত ২৬ অক্টোবর খুলনার সিভিল সার্জন ডা. মো. মনিরুজ্জামান এক অফিস আদেশে জেলার সমস্ত আউটসোর্সিং কর্মচারীকে অব্যাহতি প্রদানের নির্দেশ দেন।
জেলার ৯ উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের জুনিয়র কনসালটেন্ট এবং সদর, খালিশপুর, টুটপাড়া আরবান ডিসপেনসারি ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মেডিকেল অফিসারদের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ১৫ মাস ধরে আউটসোর্সিং জনবলের বেতনভাতা পরিশোধ করা হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত বেতন দেওয়ার চুক্তি থাকলেও তারা তা মানছে না। এই পরিস্থিতিতে রাজস্ব খাতের কর্মচারী দিয়ে সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে আউটসোর্সিং কর্মচারীদের অব্যাহতি দেওয়া হলো।
হতবাক কর্মীরা, ভেঙে পড়ে চিকিৎসাসেবা
জানা গেছে, সিভিল সার্জন যেদিন অব্যাহতির চিঠি ইস্যু করেন, ঠিক সেদিন সকালেই বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ২২ জন কর্মচারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বকেয়া বেতনের টাকা জমা হয়। কিন্তু বিকেলে সিভিল সার্জনের অব্যাহতির চিঠি হাতে পেয়ে তারা হতভম্ব হয়ে পড়েন।
এ বিষয়ে বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস সহকারী মো. রেজোয়ান রাজ বলেন, দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর দিন কাটালেও তারা সেবা থামাননি। অবশেষে হাতে টাকা আসায় আমরা তা কর্মীদের মাঝে বিতরণ করি, ঠিক তখনই এই অদ্ভূত অব্যাহতির আদেশ আসে।
এদিকে অব্যাহতির চিঠি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ক্ষুব্ধ আউটসোর্সিং কর্মচারীরা কর্মবিরতি শুরু করেন। এর ফলে জেলার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। টিকিট কাউন্টার, জরুরি অপারেশন থিয়েটার (ওটি) সেবা, ওয়ার্ড বয় ও আয়া সংকটে গোটা হাসপাতালজুড়ে হাহাকার শুরু হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অনুপস্থিতিতে নোংরা আবর্জনায় পুতিগন্ধময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ছয় দিনের মাথায় সিদ্ধান্ত বদল
পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি বিবেচনা করে মাত্র ছয় দিনের মাথায় গত ১ নভেম্বর এক অফিস আদেশে পূর্বের সেই আদেশ প্রত্যাহার করে সিভিল সার্জন সবাইকে নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সংশোধিত ওই চিঠিতে বকেয়া বেতন দ্রুত ছাড় বা পরিশোধের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ছিল না।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার সিভিল সার্জন অফিসে যোগাযোগ করা হলেও ডা. মো. মো. মনিরুজ্জামানকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার ব্যক্তিগত মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
খুলনা বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত ২১ অক্টোবর নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। খুলনার সিভিল সার্জন সেই নির্দেশনা মেনেই চিঠি ইস্যু করেছিলেন। ঠিকাদারদের দেওয়া ওয়ার্ক অর্ডার এবং সঠিক কাগজপত্রের ভিত্তিতেই কর্মীদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে নিম্ন আয়ের এসব সেবাকর্মীর স্বার্থরক্ষায় আমরা আন্তরিক আছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

