এস আলমের অবৈধ ২২ তলা ভবন এখনো অক্ষত

এস আলমের অবৈধ ২২ তলা ভবন এখনো অক্ষত

চট্টগ্রাম মহানগরীতে ভবন নির্মাণে আইন ও বিধিমালা মানার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা উপেক্ষার অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। নগরীর প্রাণকেন্দ্র চেরাগী পাহাড় মোড়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অনুমোদন ছাড়াই এস আলম গ্রুপের নির্মিত ২২ তলা ভবন এবং জামালখানে পাহাড় কেটে নির্মাণাধীন ১৭ তলা ভবন ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, একাধিকবার নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ এবং অভিযান হলেও প্রভাবশালীদের এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

ইমারত নির্মাণ আইন-২০০৮ ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী ভবন নির্মাণের আগে নকশা অনুমোদনসহ নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধ, অগ্নিনিরাপত্তা, পার্কিং, ওপেন টু স্কাই, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও পয়োনিষ্কাশনের মতো বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হয়। কিন্তু চেরাগী পাহাড় মোড়ে নির্মিত এস আলম গ্রুপের ভবনটির কোনো অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছে সিডিএ।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নগরীর চেরাগী পাহাড় মোড়ে ১৬ শতাংশ জমিতে ২০১২ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের ছেলে আহসানুল আলম। প্রায় ১৪ বছর ধরে নির্মাণের পর বর্তমানে ২২ তলা ভবনের অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে বিদ্যুৎ ও পানির লাইন, লিফট, রঙ, টাইলসসহ অন্যান্য কাজ। ভবনটিতে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ভবন নির্মাণের আগে সিডিএর নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ২০২১ সালে সিডিএর প্রতিনিধি দল ভবনটি পরিদর্শনে গেলে তাদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। পরবর্তী সময়ে ১৮ তলা নির্মাণের পর ভবনটির অনুমোদনের জন্য আবেদন করে এস আলম গ্রুপ। সিডিএ আবেদনটির সঙ্গে ১৫টি শর্ত জুড়ে দেয়। তবে এসব শর্ত পূরণ না করায় অনুমোদন প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।

সিডিএ সূত্রের দাবি, নগর পরিকল্পনা ও বিশেষ প্রকল্প শাখা থেকে আবেদনটি পাঠানো হলেও বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়ায় অথরাইজড বিভাগে তা আটকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়। এরপর ভবনটির জন্য আর অনুমোদন নেওয়া হয়নি। একই বছর ভবনের মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করে সিডিএ।

চেরাগী পাহাড় মোড়ের ওই জায়গায় আগে স্থপতি লুই কানের স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মিত লাল ভবন ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। সেখানে আমেরিকান সেন্টার, বাখরাবাদ গ্যাস অফিস ও সেন্টার পয়েন্ট হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল। পরে জমিটির মালিকানা পরিবর্তনের পর পুরোনো ভবনটি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু হয়। জমি দখল বা মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের যে অভিযোগ উঠেছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে নগরীর জামালখানে পাহাড় কেটে নির্মিত এস আলম গ্রুপের ১৭ তলা ভবন নিয়েও চলছে বিতর্ক। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর সিডিএ সেখানে অভিযান চালিয়ে ভবনের একাংশ উচ্ছেদ করেছিল। প্রায় দেড় বছর নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি আবার কাজ শুরুর অভিযোগ উঠেছে। তবে সিডিএর দাবি, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বর্তমানে তারা ভবনটিতে অভিযান চালাতে পারছে না।

সিডিএর অথরাইজড কর্মকর্তা তানজিব হোসেন বলেন, চেরাগী পাহাড় মোড়ের এস আলম গ্রুপের ভবনটির কোনো অনুমোদন নেই। ১৮ তলা নির্মাণের পর অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হলেও অনিয়মের কারণে সেটি বাতিল করা হয়। জামালখানের ভবন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পাহাড় কাটা ও বিভিন্ন অনিয়মের কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ভবন মালিকদের সতর্ক করা হয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও রয়েছে।

শুধু এস আলম গ্রুপ নয়, নগরের জামালখান, চকবাজার ও খুলশীসহ বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় পাহাড় কেটে এবং বেআইনিভাবে ভবন তৈরির কাজ চলছে। তবে এসব ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিচ্ছে না সিডিএ।

নগরীর এসএস খালেদ রোড়ে ১২৭ ফুট উচ্চতার পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের কাজ এক বছর আগে সিডিএ বন্ধ করে দিলেও আবার শুরু হয়েছে সেটির নির্মাণকাজ। ২০২২ সালে স্বপ্নীল ফ্যামিলি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নামে তিনটি বেজমেন্টসহ ১৭ তলা ভবনের অনুমোদন নেন সজল চৌধুরী, খোকন ধর, হিমেল দাশ, সুভাষ নাথ, রণজিৎ কুমার দে, রুপক সেনগুপ্তসহ ৯২ জন মালিক। তবে অভিযোগ ওঠে, কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই পাহাড়ে ভবনের জন্য অনুমোদন দেয় সিডিএ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবনটির পেছনের পাহাড় কেটে রাতের আঁধারে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে সাততলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ২০২০ সালে পাহাড় কাটার অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের ২৮ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল বলে জানা গেছে। তবে সেই অর্থ এখনো পরিশোধ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

২০২৩ সালে সিডিএ ভবন নির্মাণ বন্ধের নোটিস দিলেও হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে অভিযান বন্ধ থাকে। ২০২৪ সালে পাসের এবিসি মাহবুব হিলস ভবনের মালিকদের পক্ষ থেকেও পাহাড় কাটার অভিযোগে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।

তবে পাহাড় কাটার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্বপ্নীল ফ্যামিলি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিমেল দাশ। তার দাবি, সব নিয়মকানুন মেনেই নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছে।

স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান বলেন, সিডিএর জনবল সংকট রয়েছে। ফলে বড় অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালানো এবং তা টেকসইভাবে চালিয়ে যাওয়া কঠিন। তার মতে, সংস্থাটির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়ম ভাঙার প্রবণতা ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, ভবনের মালিক যতই প্রভাবশালী হোক, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, অভিযান সিডিএর ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ এবং বেআইনিভাবে নির্মিত ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এস আলম গ্রুপের বক্তব্য জানতে তাদের খাতুনগঞ্জের কার্যালয়ে গিয়ে কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। গ্রুপটির কোনো কর্মকর্তার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন