ফেনীতে টানা বৃষ্টি ও ভারতের পাহাড়ি ঢলে ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া, দাগনভূঞা ও সদর উপজেলার ১১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে এবারও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইতোমধ্যে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, সড়কের অন্তত শত কোটি টাকার বেশি ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য ওঠে এসেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবারের বন্যায় জেলায় ৮৪৫ হেক্টর আউশ, ৫৩৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি, ১৪ হেক্টর মরিচ, ৭ হেক্টর আদা, ২ দশমিক ৫ হেক্টর হলুদ, ০.১১ হেক্টর ৬৮৯ টমেটো, ৩ হাজার ৪৭০ হেক্টর আমন বীজতলা এবং বস্তায় সংরক্ষিত আদাসহ মোট ৫ হাজার ৫৬৪ দশমিক ৬১ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আতিক উল্লাহ বলেন, এখনও অনেক এলাকায় পানি রয়েছে। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র ও আর্থিক পরিমাণ নিরূপণ করা যাবে।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, এবারের বন্যায় এখন পর্যন্ত ফেনী জেলায় মৎস্য খাতে ৬ উপজেলার ২ হাজার ৩৩০টি পুকুর, দিঘি ও খামারের ২৭৬ দশমিক ২০ মেট্রিক টন মাছ ও ১২৮ মেট্রিক টন পোনা ভেসে গেছে। এছাড়া ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকার অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। সবমিলিয়ে ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, এটি প্রাথমিক প্রতিবেদন। চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতে উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা কাজ করছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবারের বন্যায় ফেনীতে অন্তত ১০ হাজার ৬০০টি মুরগি মারা গেছে। এর মধ্যে ফুলগাজীতে ১ হাজার ৪০০টি, পরশুরামে ৭ হাজার ২০০টি ও ছাগলনাইয়ায় ২ হাজার মুরগি মারা যায়। এ ছাড়া জেলায় বন্যায় ২৩৫টি হাঁস, ৩টি ছাগল, ১টি ভেড়া ও ৪টি গরু মারা গেছে।
প্রাণিসম্পদের খাদ্যেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। পশুপাখির ৭ টন দানাদার খাদ্য নষ্ট হয়ে গেছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।পাশাপাশি ৩০ টন খড় নষ্ট হয়েছে, যার মূল্য ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। বিনষ্ট হয়েছে ১৬০ টন ঘাস, যার আনুমানিক মূল্য ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে প্রাণিসম্পদে এবার ক্ষতি হয়েছে ৬৪ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫০ টাকা।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মোজাম্মেল হক এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, বন্যায় জেলার প্রাণিসম্পদ খাত এবারও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রাথমিকভাবে যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গবাদিপশু, হাঁস-মুরগিসহ অন্যান্য প্রাণিসম্পদে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬৪ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫০ টাকা নিরূপণ করা হয়েছে। এ ক্ষতির চিত্র আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের তথ্য মতে, এবারের বন্যায় জেলার ১২৬টি গ্রামীণ সড়কের ৩০০ কিলোমিটারে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। উপর দিয়ে পানি গড়িয়ে যাওয়ায় কোন কোন এলাকায় রাস্তার ২০ থেকে ৫০ ফুট বিলীন হয়ে গেছে।
এর মধ্যে ফুলগাজী উপজেলার ৬৯টি সড়কের ৯৫ কিলোমিটার, পরশুরামের ১৮টি সড়কের ৪৯ কিলোমিটার, ছাগলনাইয়ার ১৭টি সড়কের ১২৬ কিলোমিটার, সোনাগাজীর ১৩টি সড়কের ১০ কিলোমিটার ও ফেনী সদর উপজেলার ৯টি সড়কের ২০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে।এতে অন্তত ৯০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এলজিআরডি ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদ আল ফারুক বলেন, সড়কগুলো মেরামত করতে অন্তত ৯০ কোটি টাকার প্রয়োজন। জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করতে না পারলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কয়েকটি ডিপার্টমেন্ট প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির একটি বিবরণী দিয়েছে। যেহেতু বন্যা এখনও শেষ হয়নি। সেহেতু এটিকে চূড়ান্ত হিসেবে ধরা হচ্ছে না। এখনও জেলায় অনেক এলাকা পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যাবে। দুর্গত এলাকায় পুনর্বাসনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

