জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের কৃষি, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থায়। রাজশাহীর মাঠ থেকে পাইকারি হাট— সবখানেই বাড়ছে ব্যয়, কমছে লাভ। আর এর চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। সব মিলিয়ে বাজার অনেকটা অস্থির হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বাড়তে পারে।
পবা উপজেলার নওহাটা পাইকারি কাঁচাবাজারে সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানোর জন্য মৌসুমি সবজি সংগ্রহ ও প্যাকেটজাত করছেন ব্যবসায়ীরা। এখান থেকে প্রতিদিন লাউ, ঢেঁড়স, বাঁধাকপি, পটল, টমেটো ও শসাসহ বিভিন্ন সবজি ট্রাকে ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে পাঠানো হয়। তবে তেলের দাম বৃদ্ধির পর পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ।
ব্যবসায়ীরা জানান, তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ট্রাক ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আগে রাজশাহী থেকে সিলেটগামী একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ৩০-৩২ হাজার টাকা। এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০-৪২ হাজার টাকায়। একইভাবে ঢাকাগামী ট্রাকের ভাড়া ১৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৬-২৮ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। কারওয়ান বাজার, মিরপুর, সাভার, বাইপাইল, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন রুটে ভাড়া বেড়েছে ৫-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
মোহনপুরের মৌগাছি হাটের কাঁচামাল ব্যবসায়ী রাসেল বলেন, হঠাৎ তেলের দাম বাড়ায় আমরা চাপে পড়ে গেছি। আগে যে খরচে পণ্য পাঠাতাম, এখন অনেক বেশি খরচ হচ্ছে। লাভ তো কমছেই, অনেক সময় লোকসানও হচ্ছে। একই হাটের আরেক ব্যবসায়ী নাজির বলেন, সবজির দাম হাটে কম, কিন্তু পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে গিয়ে দাম বাড়ে। এতে আমরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, তেমনি ক্রেতারাও ভোগান্তিতে পড়ছে।
পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ায় আগের ভাড়ায় গাড়ি চালানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ট্রাকচালক ভুট্টো আলী বলেন, তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এই অবস্থায় আগের ভাড়ায় ট্রিপ দেওয়া সম্ভব না।
রাজশাহী জোসনা পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ আলী সরকার বলেন, পাম্পে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আমার প্রয়োজন এক হাজার লিটার তেল, সেখানে আমি পাচ্ছি ৩০০ লিটার। এভাবে কি গাড়ি চলবে? ডিজেলের দাম যেভাবে বেড়েছে, আগের ভাড়ায় চলা সম্ভব না। খরচ তুলতেই ভাড়া বাড়াতে হচ্ছে।
হাটের ইজারাদার আজাদ সরকার বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি হাটে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের দূর-দূরান্তে পণ্য পাঠাতে এখন অনেক বেশি খরচ করতে হচ্ছে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতে। ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। অনেকেই সময়মতো সেচ দিতে পারছেন না, যা সরাসরি ফসলের উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
পবা উপজেলার কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, আগে এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে যে খরচ হতো, এখন তার তুলনায় অনেক বেশি লাগছে। সার, বীজ, শ্রমিকের মজুরি আগেই বেড়েছিল, এখন তেলের দাম বাড়ায় অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। অনেকেই সেচ কমিয়ে দিচ্ছে, এতে ফলন কমে যাবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিবহননির্ভর শ্রমজীবীরাও পড়েছেন চাপে। পবা উপজেলার সবজি ব্যবসায়ী রুস্তুম আলী বলেন, আগে ৫০০ টাকায় নসিমনে সবজি আনতাম। এখন ৬০০-৭০০ টাকা দিতে হচ্ছে। এতে লাভ কমে যাচ্ছে। বেশি দামে বিক্রি করলে ক্রেতারা কিনতে চায় না।
শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, শহরাঞ্চলেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে পণ্য আনার খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ছে।
রাজশাহী মহানগরীর ক্রেতা আসাদুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন বাজারে গিয়ে দেখি কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। আমাদের আয় তো বাড়ছে না, কিন্তু খরচ বাড়ছে। এভাবে চললে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।
কৃষি বিশ্লেষক ও অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি একটি চেইন প্রতিক্রিয়ার মতো কাজ করে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন খরচও বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের বাজারদর বৃদ্ধি করে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ায়।
সামাজিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন ও বাজারজাতকরণ সব খাতে খরচ বাড়ে। এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। তিনি আরো বলেন, এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের জন্য ভর্তুকি বৃদ্ধি, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবহন খাতে নজরদারি জোরদার করতে হবে, যাতে অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে থাকে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে কৃষি উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজারদরের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরো কঠিন হয়ে উঠবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ বাড়বে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

