কুমিল্লার আদর্শ সদর ও বুড়িচং উপজেলার পাঁচ গ্রামের প্রায় ৫০০ একর কৃষিজমি বছরের বেশিরভাগ সময় পানির নিচে থাকায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। তিন ফসলি জমিতে এখন এক ফসল ফলাতেও হিমশিম খাচ্ছেন তারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের মাটি ভরাট করে খালের জায়গায় প্লট তৈরির চেষ্টা এবং বুড়িচংয়ের ভরাসার বাজারের বর্জ্য নিয়মিত খালে ফেলার কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে কয়েক বছর ধরে জলাবদ্ধতায় ব্যাপক ফসলহানি হলেও সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সরেজমিন দেখা যায়, কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলীর মহেশপুর ও পালপাড়া এবং বুড়িচংয়ের ষোলনল, ছয়ঘড়িয়া ও ভরাসার এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পানিতে ডুবে আছে। খালটি মহেশপুর থেকে বুড়িচংয়ের ষোলনল হয়ে পয়াতের জলাশয়ে গিয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, এসব এলাকার পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম একটি খাল। দীর্ঘদিন খনন ও পরিষ্কার না করায় খালটির বিভিন্ন অংশ সংকুচিত ও ভরাট হয়ে গেছে। গত কয়েক দিন আগে রোপা আমন ধান লাগিয়েছিলেন কৃষকরা। সব ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আবার লাগাতে গেলে কৃষকের দ্বিগুণ খরচ হবে।
ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, একসময় এসব জমিতে বোরো, আমন ও আউশÑতিন মৌসুমেই ধান চাষ করা হতো। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে এখন অনেক জমিতে বছরে একবারও ভালোভাবে চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত খালটি দখলমুক্ত, পুনঃখনন ও পরিষ্কার করা না হলে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বানাসুয়া গ্রামের কৃষক মো. রনি ষোলনল এলাকায় ৩০ শতক জমি চাষ করেন। তিনি বলেন, আগে তিন ফসল করতাম। এখন একটি ফসল ঘরে তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রায় ২০ বছর ধরে খালটি ঠিকমতো খনন করা হয়নি। এ কারণে শত শত একর জমি পানির নিচে পড়ে থাকে।
বুড়িচংয়ের ষোলনল গ্রামের কৃষক হুমায়ুন কবির বলেন, গত কয়েক বছর ধরে আমাদের ফসল নষ্ট হচ্ছে। গত বছর ১০০ শতক জমির বোরো ধান বাড়ি তুলতে পারিনি। ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শুধু এই একটি খাল ভরাট ও অপরিষ্কার থাকার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, আগে বোরো, আমন ও আউশÑতিন ধরনের ধান চাষ করতে পারতাম। এখন বোরো চাষ করলেও ধান কাটার সময় জমিতে পানি থাকে। অনেক ফসল ঘরে তুলতে পারি না। দীর্ঘদিন ধরে খালটি খনন বা পরিষ্কার করা হয় না।
এ বিষয়ে স্থানীয় যুবদল নেতা আব্দুল কাদের আমার দেশকে বলেন, খালটির মাঝখানের কিছু অংশ কিছু প্রভাবশালী ভরাট করেছে । আমরা প্রশাসনকে অবহিত করেছি, শিগগির খালটি উদ্ধার করা হবে ।
তিনি আরো বলেন, আগে আমাদের এই এলাকার কৃষকরা তিন ফসল উৎপাদন করতে পারতেন । এখন পানির নিচে তলিয়ে আছে শত শত একর জমি । আমি স্থানীয় এমপির সঙ্গে কথা বলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করব। আওয়ামী লীগ আমলে একবারও খালটি পরিষ্কার করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের বিভিন্ন অংশে মাটি ফেলে ভরাটের কারণে পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে। আবার ভরাসার বাজারের বর্জ্য খালে ফেলার কারণে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়েছে।
আদর্শ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, বিষয়টি এর আগেও আমরা দেখেছি। কয়েকটি জায়গায় মাটি কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমাতুজ জোহরা আমার দেশকে বলেন, স্থানীয় কয়েকজন কৃষক বিষয়টি নিয়ে আমার কাছে এসেছেন। আমি একজন কর্মকর্তাকে সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য পাঠিয়েছি। শিগগির খালটি খননের ব্যবস্থা করা হবে। যারা খাল ভরাট করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, শুধু খাল খনন করলেই হবে না, খালের জায়গা দখল বা মাটি ভরাটের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি বাজারের বর্জ্য খালে ফেলা বন্ধ করে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে জলাবদ্ধতা আরো বেড়ে কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

