সরকারি আদেশ মানতে নারাজ চট্টগ্রামের সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি

সরকারি আদেশ মানতে নারাজ চট্টগ্রামের সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি

দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি আইনি নীতিমালা ও ইউজিসির নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য হলেও চট্টগ্রামের সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এসইউবি) যেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওটি) ও একাডেমিক কাউন্সিল সরকার কিংবা ইউজিসির (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) কোনো আদেশই মানছে না। উল্টো সরকারি প্রজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে একের পর এক হাইকোর্টে রিট করে নিজস্ব নিয়মে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন তারা। গত সাড়ে তিন বছরে সরকারি বিভিন্ন আদেশের বিরুদ্ধে তারা অন্তত আটটি রিট দায়ের করেছেন। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের এ বিরোধ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও একাডেমিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

২০২৫ সালের ২৫ মে রাষ্ট্রপতির আদেশে আর্মি হেডকোয়ার্টার্সের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ফারুককে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই নিয়োগের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করা হলে প্রাথমিকভাবে সে আদেশ স্থগিত হয়। তবে পরবর্তী শুনানিতে আদালত প্রশাসক নিয়োগকে বৈধ ঘোষণা করে। তবে আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে পছন্দের উপাচার্য দিয়েই দাপ্তরিক কার্যক্রম সারছে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, আদালতের সিদ্ধান্তের পরও প্রশাসককে কার্যত দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করা হয়নি। আর্থিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাকে সম্পৃক্ত করা হয়নি এবং বিভিন্ন নোটিসের অনুলিপিও দেওয়া হয়নি।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ট্রেজারার ড. শরীফ আশরাফুজ্জামানকে ভারপ্রাপ্ত ভিসি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ভিসি হিসেবে বক্তব্য রাখছেন।

সাড়ে তিন বছরে আট রিট

আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির বিওটি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানের দায়ের করা একটি রিটের ফলে শিক্ষকদের বেতন ও ইনক্রিমেন্ট-সংক্রান্ত ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। একই বছর ট্রাস্টি সদস্য সরোয়ার জাহানের করা আরেকটি রিটে তৎকালীন ভিসি প্রফেসর মোজাম্মেল হকের কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণা করে আদালত, যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভিসি মোজাম্মেল হককে বৈধ বলে সিদ্ধান্ত দেয়। ২০২৪ সালে একই ভিসির বিরুদ্ধে আরেকটি রিট দায়ের ও মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে পরাজিত হয়ে আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ করা হয়। সবশেষ বর্তমান প্রশাসকের বিরুদ্ধেও একটি রিট ও একটি লিভ টু আপিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত আটটি রিট দায়ের করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই করেছেন বিওটি সদস্য সরোয়ার জাহান।

দুর্নীতি ঢাকতে সাবেক ভিসিকে ‘যুদ্ধাপরাধীর সহযোগী’ আখ্যা

২০২১ সালের ১ এপ্রিল চুয়েটের সাবেক ভিসি প্রফেসর প্রকৌশলী মোজাম্মেল হককে ৪ বছরের জন্য সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বিওটি সদস্য সরোয়ার জাহানের আর্থিক দুর্নীতির বেশকিছু নথিপত্র শনাক্ত করেন। এর মধ্যে রয়েছে—একটি কোচিং সেন্টার ও ব্যক্তি নামে এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা খুলে আর্থিক দুর্নীতি, ঋণের নামে ফান্ড থেকে নিজ নামে ৭৫ লাখ টাকার চেক সই করানোর চেষ্টা এবং প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে প্রায় সাত কোটি টাকা আত্মসাৎ।

এসব অনিয়ম ভিসি মোজাম্মেল হক দুদক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানালে ইউজিসির পাঁচ সদস্যের কমিটি তদন্ত শুরু করে। গত বছরের জানুয়ারিতে কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনে সরোয়ার জাহান ও তার স্ত্রী ইসরাত জাহানের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি ও সনদ জালিয়াতি প্রমাণিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ এর অধিকাংশ ধারা লঙ্ঘন করেছেন। ইসরাত জাহান জাল সনদ প্রদান ও লাভজনক শিক্ষক পদে কর্মরত আছেন। এছাড়া সরোয়ার জাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে জমি ক্রয় না করে নিজের নামে করেছেন। এক ডজনের বেশি অভিযোগের বেশিরভাগেই প্রমাণ মিলেছে তাদের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওটি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান ভিসির সঙ্গে অশোভন আচরণ করতেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে সরোয়ার জাহানসহ দুজনের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করে, যা বর্তমানে বিচারাধীন।

ভিসির অপসারণ নিয়ে আইনি বিতর্ক

এই অভিযোগ দায়েরের জের ধরে ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল বিওটি অধ্যাপক মোজাম্মেল হককে উপাচার্যের পদ থেকে অপসারণ করে। তার বিরুদ্ধে আদালতে তিনটি রিট দায়েরের পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে যুদ্ধাপরাধী উল্লেখ করে তার সহযোগিতায় প্রফেসর মোজাম্মেল হক চুয়েটের ভিসি ছিলেন বলে দাবি করা হয়। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, রাষ্ট্রপতি ছাড়া ভিসি মোজাম্মেল হককে মেয়াদের আগে অন্য কোনো ব্যক্তি দ্বারা অপসারণ করা বেআইনি।

আওয়ামী নেতা ও ঋণখেলাপিরা ট্রাস্টি বোর্ডে

২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডে আওয়ামী লীগের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং চট্টগ্রাম-৮ আসনের সাবেক এমপি আবদুচ সালামকে সদস্য করা হয়েছিল। যদিও বর্তমানে ওয়েবসাইট থেকে তাদের নাম সরানো হয়েছে। এছাড়া বিওটি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪৫৯ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলার আসামি। এক রিটের শুনানিতে আদালত বিওটি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, সদস্য সরোয়ার জাহান ও তার স্ত্রী ইসরাত জাহানকে অযোগ্য এবং অন্য সদস্যদের নিষ্ক্রিয় উল্লেখ করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত নতুন বোর্ড অব ট্রাস্টিজ গঠন করা হয়নি।

দুই হাজার সনদ বাতিলের শঙ্কা

২০২৪ সালের এপ্রিলে ভিসি মোজ্জাম্মেল হককে অবৈধভাবে অপসারণের পর ট্রাস্টি সরোয়ার জাহানের নির্দেশে ট্রেজারার শরীফ আশরাফুজ্জামান ভিসির দায়িত্ব নেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু তিনি বৈধ ভিসি নন, তাই তার সময়কালে দেওয়া প্রায় দুই হাজার সনদ বাতিল হতে পারে, যা শত শত শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ারকে হুমকিতে ফেলেছে। ২০১৪ সালে জেলা প্রশাসনের শিক্ষা শাখার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত এ জে ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান রেজাউল আলম ও এস. এম আলিম ২০০৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করলেও তাদেরই একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সরোয়ার জাহানকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে কাজের সুবাদে তাকে ওয়ার্কিং পার্টনার করা হলে তিনি জালিয়াতি করে বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্যোক্তা সেজে অন্য একটি পক্ষের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। যা নিয়ে আদালতে উভয়পক্ষের মধ্যে তিনটি মামলা চলছে। ২০২৪ সালের জুনে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির জাল সনদের কারবার সামনে আনেন সাবেক ভিসি মোজাম্মেল হক। ওইসময় তিনি ৫০০টি সনদের মধ্যে ১০৫টি জাল বলে শনাক্ত করেন। ২০১৭ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে জাল সনদ প্রমাণিত হওয়ায় চারজনকে কারাগারে পাঠায় আদালত।

সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সাবেক ভিসি প্রফেসর মোজাম্মেল হক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি এক ব্যক্তির নিয়মে চলে। বিওটির অন্য সদস্যরা অযোগ্য হওয়ায় নীরব থাকে। সব অনিয়ম ব্যক্তির হলেও মামলার খরচ যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ড থেকে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামী-স্ত্রী মিলে জাল সনদের ব্যবসা ও ম্যানেজমেন্টকে পারিবারিকীকরণ করার এমন নজির নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাচারিতা থামাতে বিওটিতে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামূলক করা দরকার।

এসব বিষয়ে বিওটি সদস্য সরোয়ার জাহান ও সাবেক ট্রেজারার ড. শরীফ আশরাফুজ্জামানকে একাধিকবার কল ও মেসেজ দেওয়া হলেও তারা সাড়া দেননি।

এসইউবির প্রশাসক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ফারুক বলেন, আমি কারো কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি। বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আমার যে পরিকল্পনা ছিল সেটি নিয়েও কাজ শুরু করতে পারিনি। নানাবিধ সমস্যা রয়েছে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন