হরমুজ প্রণালি বন্ধে জ্বালানি খাতে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

হরমুজ প্রণালি বন্ধে জ্বালানি খাতে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলাকে কেন্দ্র করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে হরমুজ প্রণালি। ফলে বিশ্বব্যাপী তৈরি হয়েছে জ্বালানি সংকটের শঙ্কা। কারণ, বিশ্বের যাবতীয় জ্বালানি তেল পরিবহনের অন্যতম রুট এই প্রণালি। যুদ্ধের কৌশলগত কারণে গুরুত্বপুর্ণ এ নৌরুট বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

এরই মধ্যে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) নিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য নির্ধারিত এমটি নর্ডিক পলাঙ নামে একটি মাদার ভেসেল সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকা পড়েছে। আগামী ২২ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আরেকটি জাহাজের শিডিউল রয়েছে। সংকটের কারণে সে শিডিউলেও বিপর্যয় নামার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগামী পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে জাহাজগুলো রওনা করতে না পারলে কাঁচামাল সংকটে পড়বে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধের কারণে ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বন্দরগুলোয় আটকা পড়েছে অন্তত ৭০০ জ্বালানি তেলবাহী মাদার ট্যাংকার। এর মধ্যে বাংলাদেশ অভিমুখে আসা একটি ট্যাংকারও রয়েছে। জাহাজটিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মালিকানাধীন এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) রয়েছে। গত ২ মার্চ সকালে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারির উদ্দেশে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরের জেটি থেকে নোঙর তোলার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ের আগে ক্রুড লোড করলেও যুদ্ধের কারণে রওনা হতে পারেনি জাহাজটি।

ইস্টার্ন রিফাইনারি সূত্র জানায়, আগামী ২২ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবল ধান্না বন্দর থেকে আরো এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে আরেকটি মাদার ভেসেল বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ওই বন্দরেও জট তৈরি হয়েছে। শিডিউল ডেটের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও জট নিরসনে নির্ধারিত সময়ে ওই জাহাজও নোঙর তুলতে পারবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। পরিস্থিত স্বাভাবিক না হলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্রটি জানায়, সময়মতো ক্রুড অয়েল দেশে না পৌঁছালে সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের ওপর। চট্টগ্রামের পতেঙ্গার শোধনাগারটি অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন জ্বালানি উৎপাদন করে। কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের জ্বালানি বাজারে আরো চাপ বাড়িয়ে দেবে।

এ অবস্থায় এখন থেকেই বিকল্প পথ অনুসন্ধান করার তাগিদ দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার মানজারে খোরশেদ আলম জানান, যে যত কথায় বলুক, এক মাসের বেশি জ্বালানি মজুত থাকার কোনো সুযোগ বাংলাদেশে নেই। সাপ্লাই চেইন কাটেল হওয়ার এক সপ্তাহ হতে চলল। বড় জোর আর তিন সপ্তাহ চলবে। এরই মধ্যে বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হবে। এতে হয়তো খরচ একটু বাড়বে কিন্তু সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখতে হলে এর বিকল্প নেই। অপরিশোধিত তেলের জন্য হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে আবুধাবির জায়েদ বন্দর ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পরিশোধিত তেল আনতে হবে। এক্ষেত্রে সাপ্লায়ারদের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে এখনই। কারণ, আমদানিনির্ভর সব দেশই এখন বেশি মজুত থাকা দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে উঠেপড়ে লাগবে। সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে সংকটে পড়বে পুরো দেশ।

বিপিসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১২ দিনের অকটেন, ১৩ দিনের পেট্রোল, ২৬ দিনের ডিজেল, ২৮ দিনের জেট ফুয়েল, ৯০ দিনের ফার্নেস অয়েল, ৪০ দিনের মেরিন ফুয়েল এবং ১৩৮ দিনের কেরোসিন মজুত রয়েছে। রিফাইনড অয়েল মূলত সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে আমদানি হয়ে চট্টগ্রামে আসে। এ চেইন এখনো স্বাভাবিক থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য সংকটে দাম বেড়েছে সবখানে।

বিপিসির জিএম পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে জানান, গত মাসের শেষ সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৮৫ ডলার করে। বুধবার কিনতে হয় ১১৮ ডলারে। গত ২ মার্চ দাম ছিল ১০৯ ডলার প্রতি ব্যারেল। ৪ মার্চ দুদিনের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার করে। গত মাসে প্রতি টন ফার্নেস অয়েল ৪২৬ ডলারে বিক্রি হলেও বুধবার প্রতি টন ফার্নেস অয়েল বিক্রি হয় ৫২৫ ডলারে। অকটেন, পেট্রোল, জেট ফুয়েল, কেরোসিনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও একটি সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে জ্বালানি তেলের সাপ্লাই চেইন তৈরি করা হয়। এখানে হঠাৎ করে পরিবর্তন আনা কঠিন। কিন্তু সংকটটি এসেছে হঠাৎ করে। এর ওপর নতুন সরকার। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন। এরপরও মন্ত্রণালয়, সরকার ও বিপিসি যৌথভাবে বিকল্প পথের অনুসন্ধান করছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ হাসনাত জানান, প্রতি মাসে এক লাখ টনের একটি করে জাহাজ রিফাইনারিতে আসে। ২ মার্চ যে জাহাজটি সৌদি আরব থেকে নোঙর তোলার কথা ছিল, সেটি ১৩ দিন পর অর্থাৎ ১৫ মার্চ রিফাইনারির জেটিতে নোঙর করার কথা ছিল। জাহাজটি ক্রুডভর্তি করে অলস ভাসছে। যুদ্ধের কারণে রওনা করতে পারছে না। চলতি মাসের ২২ তারিখে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আরেকটি জাহাজের রওনা করার শিডিউল রয়েছে। আপাতত এক মাসের কাঁচামাল সংরক্ষিত আছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজ আসতে ১৩-১৪ দিন সময় লাগে। এরপর বার্থিং ও আনলোডের পর প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু হয়। সব মিলিয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জাহাজ রওনা করতে না পারলে সংকট তৈরি হওয়ার শঙ্কার কথা জানান তিনি।

জ্বালানি বিশ্লেষক ইঞ্জিনিয়ার মানজারে খোরশেদ আলম জানান, বিশ্বের জ্বালানি তেলের বড় অংশটিই পরিবহন করা হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এ রুট দীর্ঘ সময় অচল থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। সেক্ষেত্রে শুধু আমদানি ব্যয় নয়; অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায়ও স্থবিরতা নামবে। বাংলাদেশের বর্তমান মজুত তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়ার মতো হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তাই কালবিলম্ব না করে বিকল্প আমদানি উৎসের সন্ধান ও কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এখনই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...