বাস্তবায়ন হয়নি আগের দুই মাস্টারপ্ল্যান, নতুন পরিকল্পনায় সিডিএ

বাস্তবায়ন হয়নি আগের দুই মাস্টারপ্ল্যান, নতুন পরিকল্পনায় সিডিএ

চট্টগ্রামকে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ১৯৬১ ও ১৯৯৫ সালে দুটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছিল। তবে দুই পরিকল্পনার প্রায় ৮০ শতাংশই বাস্তবায়িত হয়নি। বরং গত তিন দশকে মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত না থাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে, দখল হয়েছে খাল-নালা, বেড়েছে অনিয়ন্ত্রিত ভবন নির্মাণ ও যানজট। পাহাড় কাটা, পুকুর ভরাট ও সবুজ এলাকা ধ্বংসের ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন সময়।

এসবের মধ্যেই নতুন করে ২৫ বছরের মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সংস্থাটির দাবি, ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৮৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট আইন সংস্কার না হলে আগের দুই মাস্টারপ্ল্যানের মতো নতুন পরিকল্পনাও কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

বিজ্ঞাপন

পরিবেশবাদী সংগঠন, এনজিও এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সর্বশেষ ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম নগরের জন্য মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদিত হয়। এতে পাহাড় সংরক্ষণ, বাসযোগ্য আবাসন, ৩৩ শতাংশ কৃষিজমি রক্ষা, সাতটি বাস টার্মিনাল, ১৩টি প্রধান সংযোগ সড়ক, ১১টি রেলওয়ে ওভারব্রিজ নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা সংরক্ষণের পরিকল্পনা ছিল। অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ ঠেকানোর বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু গত ৩০ বছরে এর অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি। বিভিন্ন গবেষণা ও পরিবেশবাদী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী নগরের প্রায় ১২০টি পাহাড় বিলীন হয়ে গেছে। প্রভাবশালীরা এসব পাহাড় কেটে কেউ আবাসিক এলাকা বানিয়েছেন, কেউ কেউ বহুতল ভবন তুলে ভাড়া দিচ্ছেন; আবার কেউ পাহাড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে মানবিক হওয়ার ধুয়া তুলেছেন। এছাড়াও গত দুই দশকে চট্টগ্রামে ২৩ হাজার পুকুর হারিয়ে গেছে। লালদীঘি, আসকারদীঘি, কমলদীঘি, আগ্রাবাদ দীঘি, ভেলুয়া সুন্দরীর দীঘি, রানির দীঘি, রাজাপুকুর, হাজারী দীঘি, মুন্সিপুকুরসহ বড় বড় ঐতিহ্যবাহী জলাশয় ‍ভরাট করে ভবন তোলা হয়েছে।

এছাড়া নগরের অন্তত ৫০০ ভবন খালের ওপর নির্মিত হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় সেনাবাহিনী কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও বহু খাল এখন পর্যন্ত দখলমুক্ত হয়নি। অবকাঠামো নির্মাণে কাটা হয়েছে শতবর্ষী বহু গাছ, সংরক্ষণ করা হয়নি ঐতিহাসিক স্থাপনাও। মাস্টারপ্ল্যানে উল্লেখ থাকা ১১টি রেলওয়ে ওভারব্রিজও নির্মিত হয়নি। বরং সবুজ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত স্থানে গড়ে উঠেছে আবাসিক প্রকল্প। অপ্রয়োজনে নিচের সড়ককে কোণঠাসা করে ব্যয়বহুল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করা হয়েছে। এসবের জন্য সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সিডিএকে শক্তিশালী না করাকে দায়ী করেছেন পরিবেশকর্মী ও নগর বিশেষজ্ঞরা।

নগরবিদরা বলছেন, মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু সিডিএর নয়; চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, বন্দর কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা আরো বলেন, গণশুনানির বর্তমান পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি। খসড়া পরিকল্পনা আগে জনসমক্ষে প্রকাশ করে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে নাগরিকদের মতামত নেওয়া উচিত। একদিনের গণশুনানিতে কার্যকর মতামত পাওয়া সম্ভব নয়। ব্যয় বাড়ানো হলে এই মাস্টারপ্ল্যান আরো বিস্তারিত ও শক্তিশালী হতো বলে মনে করছেন অনেকে।

সিডিএর পরিকল্পনা

সিডিএ সূত্র জানায়, ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যানের মেয়াদ ছিল ২০ বছর। ২০১৫ সালে মেয়াদ শেষ হলেও নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন শুরু হয় ২০১৭ সালে। তবে নানা জটিলতায় তা শুরু করতেই পাঁচ বছর পেরিয়ে যায়। ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কথা রয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

মহাপরিকল্পনার আওতায় নগরের ৪১ ওয়ার্ডের পাশাপাশি পাঁচটি পৌরসভা, দুটি উপজেলা ও ছয়টি উপজেলার আংশিক যুক্ত করা হবে নগরের সঙ্গে। এতে এক হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শহর হবে চট্টগ্রাম। এতে মৌজা ম্যাপিং, পরিবহন, পরিবেশ, ভৌত অবকাঠামো ও আর্থ-সামাজিক জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। স্ট্রাকচার, ট্রাফিক, ট্রান্সপোর্ট, স্ট্রর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মাস্টারপ্ল্যানসহ ছয়টি কম্পোনেন্টের সমন্বয়ে এই মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে। এতে ১৯ খাতে ২৭৬টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। পাহাড়, জলাশয় ও কর্ণফুলী নদী সংরক্ষণের পাশাপাশি ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ ধারণার মাধ্যমে নগরের ওপর চাপ কমানোর পরিকল্পনাও এতে রাখা হয়েছে। পর্যটন, অর্থনৈতিক বিকাশ, নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন হবে এই মহাপরিকল্পনার অন্যতম অংশ।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব জিয়া হাবিব আহসান বলেন, আগের মাস্টারপ্ল্যান কার্যত বাস্তবায়ন হয়নি। বিভিন্ন সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সরকারি সংস্থার কর্মকাণ্ডে পাহাড়, খাল, নদী এবং পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সব সংস্থার সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে পাহাড়, পুকুর, খাল ও সবুজ উদ্যান সংরক্ষণে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

নগর বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিক কমিটি চট্টগ্রামের সভাপতি দেলোয়ার মজুমদার বলেন, মাস্টারপ্ল্যান হলো অতীতকে সুরক্ষিত রেখে বর্তমানকে গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করার একটি রূপরেখা। কিন্তু ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার হয়নি। ফলে পরিকল্পনাটির কিছুই বাস্তবায়ন করা হয়নি। নতুন মহাপরিকল্পনা কার্যকর করতে হলে আইন সংস্কার, সিডিএর জনবল বৃদ্ধি এবং সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এটিও কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, অতীত নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। নগরীকে বাসযোগ্য করতে সিডিএর ইমারত আইন মানতে সবাইকে বাধ্য করা হবে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে কাজ করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন