ভোটার হতে গেজেটের বাইরে শর্ত

সীতাকুণ্ড নির্বাচন অফিসে হয়রানির অভিযোগ

সীতাকুণ্ড নির্বাচন অফিসে হয়রানির অভিযোগ
ছবি: আমার দেশ

নতুন ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাওয়ার মতো মৌলিক নাগরিক সেবা নিতে গিয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সরকারি গেজেটে উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার প্রত্যয়নপত্রসহ অতিরিক্ত কাগজপত্র জমা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাচন অফিসের বিরুদ্ধে।

সরকারি বিধিতে বাধ্যতামূলক নয়, এমন কাগজপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে আবেদনকারীদের একাধিকবার নির্বাচন অফিস, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও কম্পিউটার দোকানে ছুটতে হচ্ছে। এতে সময়, অর্থ ও শ্রমের অপচয়ের পাশাপাশি বাড়ছে হয়রানি। বিষয়টিকে সরকারি গেজেটবিরোধী উল্লেখ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম বলেছেন, গেজেটের বাইরে এ ধরনের শর্ত গ্রহণযোগ্য নয়।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিন অনুসন্ধান, ভুক্তভোগী, জনপ্রতিনিধি এবং নির্বাচন অফিস সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাচন অফিসে নতুন ভোটার নিবন্ধনের জন্য ২২ দফার একটি নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের হাতে ওই তালিকা ধরিয়ে দিয়ে কমপক্ষে নয় ধরনের কাগজপত্র সংগ্রহ করে আনতে বলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তালিকায় থাকা অতিরিক্ত কাগজপত্র জমা না দিলে আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে না। অথচ নির্বাচন কমিশনের সরকারি গেজেটে এসব কাগজপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়নি।

সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ এবং মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রসহ সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নতুন করে বিভিন্ন কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের মা-বাবার এনআইডি নেই, দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন কিংবা অভিভাবক মারা গেছেন, তাদের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠছে।

সেবাপ্রার্থী সোহাগ আমার দেশকে বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সব কাগজপত্র নিয়ে যাওয়ার পরও আবার নতুন কাগজ আনতে বলা হচ্ছে। একটি সাধারণ কাজ শেষ করতে বারবার নির্বাচন অফিসে যেতে হচ্ছে। অতিরিক্ত কাগজপত্র সংগ্রহ করতে না পেরে অনেক আবেদনকারী নতুন ভোটার হওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করতে পারছেন না।

ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা ইত্তেখার আলম আমার দেশকে বলেন, তার ভাবি বেদনা আলমের জাতীয় পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত একটি সাধারণ কাজের জন্য দীর্ঘদিন নির্বাচন অফিসে যেতে হয়েছে। কাজের অগ্রগতি জানতে গেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অসৌজন্যমূলক আচরণেরও শিকার হতে হয়েছে।

অতিরিক্ত কাগজপত্রের অভিযোগের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত ২৩ জুলাই দুপুরে সরেজমিনে উপজেলা নির্বাচন অফিসে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের কক্ষে লাইট ও ফ্যান চালু থাকলেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। পরে এক কর্মচারী এসে কক্ষটি বন্ধ করেন।

অপেক্ষমাণ সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, অফিস চলাকালে অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাওয়া যায় না। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেককে সেবা না নিয়েই ফিরে যেতে হয়।এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, সরকারি গেজেটের কোথাও বলা নেই যে প্রত্যয়নপত্র ছাড়া নতুন ভোটার হওয়া যাবে না। অনেকেই এসব প্রত্যয়নপত্রে আমার স্বাক্ষর নিতে এসেছিলেন, কিন্তু আমি কোনো স্বাক্ষর করিনি। সরকারি গেজেটের বাইরে গিয়ে নাগরিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রত্যয়নপত্র বা কাগজপত্র চাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।উপজেলা নির্বাচন অফিসের সহকারী নির্বাচন কর্মকর্তা মো. কামাল উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, সরকারি গেজেটে এসব শর্ত নেই, এটি সত্য। তবে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা সেভাবেই আবেদনকারীদের জানাচ্ছি।নির্বাচন অফিসের এই নির্দেশনার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদেও। মুরাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব নির্মল চন্দ্র দাস আমার দেশকে বলেন, নির্বাচন কমিশনের গেজেটে প্রত্যয়নপত্রের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু নির্বাচন অফিসের দাবির কারণে প্রতিদিন বহু মানুষ প্রত্যয়নপত্রের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে আসছেন।স্থানীয় কয়েকজন কম্পিউটার ব্যবসায়ী সৈকত জানান, নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্র টাইপ, স্ক্যান ও প্রিন্ট করতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ তাঁদের দোকানে আসছেন। এতে সাধারণ মানুষের বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আশরাফ আমার দেশকে বলেন, গেজেটের বাইরে কোনো শর্ত আরোপ করে নাগরিকদের হয়রানি করা গ্রহণযোগ্য নয়। অতিরিক্ত শর্তের আইনগত ভিত্তি থাকলে তা স্পষ্ট করা উচিত। আর সরকারি নিয়মের বাইরে কোনো প্রক্রিয়া চালু হয়ে থাকলে সেটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ভুক্তভোগী নাগরিক, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সচেতন মহল নির্বাচন কমিশন, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাছে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, ভোটার নিবন্ধনের মতো একটি মৌলিক নাগরিক সেবা সরকারি গেজেট অনুযায়ী সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্তভাবে নিশ্চিত করতে হবে। গেজেটবহির্ভূত কোনো শর্ত কার্যকর হয়ে থাকলে তার আইনগত ভিত্তি জনসম্মুখে প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন