সংকট নিরসনে চুয়েটে ইউজিসির প্রতিনিধিদল

সংকট নিরসনে চুয়েটে ইউজিসির প্রতিনিধিদল

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনে ক্যাম্পাসে গেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ছয় সদস্যের পরামর্শক কমিটি। বুধবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে পৃথকভাবে মতবিনিময় করছেন কমিটির সদস্যরা। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত ও প্রস্তাবনা শুনে সংকট নিরসন এবং শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার বিষয়ে সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দেবেন তারা।

এদিকে টানা ৩৬ দিন বন্ধ থাকার পর আজ থেকে চুয়েটে ক্লাস ও পরীক্ষা শুরুর কথা রয়েছে। তবে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরও একই দাবিতে আন্দোলন ও অসহযোগ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা কার্যক্রম ফিরলেও প্রশাসনিক সংকটের সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত ১৯ অক্টোবর ছয় সদস্যের এই পরামর্শক কমিটি গঠন করে ইউজিসি। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুনকে। সদস্যসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন ইউজিসির অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মহিবুল আহসান। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অতিরিক্ত সচিব মাহবুবুল হক পাটোয়ারী।

কমিটির নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত শিক্ষকদের সঙ্গে, বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে, বেলা আড়াইটা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে এবং সাড়ে ৩টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি, শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকার প্রভাব এবং সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রস্তাব গুরুত্ব পাবে।

কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, সবার সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই তাদের লক্ষ্য। আলোচনার পর তারা সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দেবেন।

চুয়েটের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক রাশিদুল হাসান বলেন, ইউজিসির কমিটির সঙ্গে বৈঠকের পর ক্লাস ও পরীক্ষা শুরুর সুনির্দিষ্ট তারিখ জানা যাবে।

যেভাবে শুরু সংকট

গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রধান দাবি ছিল সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহাল এবং নতুন উপাচার্যের নিয়োগ প্রত্যাহার।

পরবর্তী সময়ে একই দাবিতে শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতি ও অসহযোগ কর্মসূচিতে যোগ দেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও ব্যবহারিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন, পরীক্ষা আয়োজন ও সম্ভাব্য সেশনজট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে গত ১৬ অক্টোবর অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪৫তম জরুরি সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় চলমান সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি পরামর্শক কমিটি গঠন করে।

কমিটিতে চুয়েটের প্রতিনিধি নেই

চুয়েটের সংকট নিরসনে গঠিত পরামর্শক কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির কোনো শিক্ষক বা প্রতিনিধি রাখা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের পরিস্থিতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন কাউকে কমিটিতে রাখা হলে সংকটের কারণ চিহ্নিত করা সহজ হতে পারত।

চুয়েট শিক্ষক সমিতির নেতারাও কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রতিনিধি না থাকার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের প্রশ্ন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নিরসনে কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের মতামত কীভাবে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে?

এ অবস্থায় আজকের মতবিনিময় সভাগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এসব বৈঠকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য কতটা গুরুত্ব পায় এবং ইউজিসির সুপারিশে সংকটের মূল কারণগুলো কীভাবে উঠে আসে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি।

দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার মধ্যে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শ্রেণিকক্ষে ফেরার সিদ্ধান্তকে আন্দোলন প্রত্যাহার হিসেবে দেখছেন না শিক্ষার্থীরা। সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথা রয়েছে।

এ কারণে ক্লাস শুরু হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে, এমনটি বলার সুযোগ নেই। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে আস্থার সংকট কাটানো এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধের সমাধান করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ইউজিসির পরামর্শক কমিটি সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য শুনে কী সুপারিশ দেয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেসব সুপারিশের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থিতিশীল পরিবেশ কত দ্রুত ফিরে আসে—এখন সেদিকেই নজর চুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন