শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় কুরবানির পশু কেনা, হাসিল দেওয়া, কসাই ও শ্রমিক ঠিক করা থেকে শুরু করে মাংস কাটার সরঞ্জাম জোগাড়—সব মিলিয়ে ঝক্কি-ঝামেলার শেষ নেই। বিশেষ করে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, সাংবাদিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের মতো ব্যস্ত পেশাজীবীদের এই পুরো প্রক্রিয়া সামলানোর সময় মেলা ভার। আর এই ব্যস্ততা ও ঝামেলা এড়াতে চট্টগ্রামের নাগরিক জীবনে এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘অনলাইন শরিকানা কুরবানি’।
চট্টগ্রামে গড়ে ওঠা বেশ কিছু আধুনিক এগ্রো ও মিট শপ এখন শহুরে ক্রেতাদের এই ঝামেলামুক্ত কুরবানির সুবিধা দিচ্ছে। এর মধ্যে 'মিট বাজার এগ্রো', 'চট্টলা বাজার' ও 'সাবেরা এগ্রো মিট শপ' অন্যতম। এসব প্রতিষ্ঠানে বুকিং দিয়ে শুধু টাকা পরিশোধ করলেই মিলছে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা কোরবানি মাংস। কোন কোন ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত টাকাও ফেরত পাচ্ছেন কোরবানিদাতারা।
আকর্ষণীয় প্যাকেজ ও বুকিংয়ের চিত্র
চলতি বছর এই অনলাইন শরিকানা কুরবানির ব্যাপক সাড়া দেখা যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী
সাত বছর ধরে আয়োজনটি করে আসা প্রতিষ্ঠান চট্টলা বাজারে এ বছর ২০টি গরুতে ১৪০ জন অংশ নিয়েছেন৷ প্রতি গরুর বিপরীতে সাতজন করে অংশ নিয়েছেন। যেখানে ২০,০০০ টাকায় ঝক্কি ঝামেলা থেকে মুক্তি মিলেছে।
৩ বছর ধরে এমন প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা প্রতিষ্ঠান মিট বাজার এগ্রোতে এ বছর ৩৩টি গরুতে অংশ নিয়েছেন ২৩১ জন৷ এর মধ্যে তারা ১৭ হাজার, ১৯ হাজার ও ২১ হাজার টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল৷ প্রতিষ্ঠানটি সূত্রে জানা গেছে, ১৭ হাজার টাকার প্যাকেজে ১৭ কেজি থেকে ২২ কেজি মাংস পাওয়া যাবে। সেই হিসেবে টাকার অঙ্কে মাংসের কেজি প্রায় একই থাকবে।
সাবেরা এগ্রো মিট শপ এ বছর ৬৭টি গরু কোরবানি দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি তিন বছর ধরেই আয়োজন করে আসছে। যেখানে এ বছর ৪৫৫ জন শরিকানা কোরবানি করছেন। তারাও ১৭,৫০০, ২২,০০০ ও ২৭,০০০ টাকার প্যাকেজ অনুযায়ী মাংস বণ্টন করবে।
কেন জনপ্রিয় হচ্ছে এই মাধ্যম?
ক্রেতা ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই ব্যবস্থার মূল সুবিধা হলো 'সব ঝামেলা থেকে মুক্তি। চট্টলা বাজারের স্বত্বাধিকারী এবিএম ইমরান হোসসাইন জানান, শহর এলাকায় অনেক সময় একসঙ্গে কুরবানি দেওয়ার মতো ভালো শরিকদাতা পাওয়া যায় না। তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে অচেনা সাতজন শরিককে এক করে দেন এবং সম্পূর্ণ ধর্মীয় বিধান মেনে সমানভাগে মাংস বণ্টন করেন।
সাবেরা মিট এগ্রো শপের কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাহাত জানান, কসাই ও প্যাকিংয়ের ঝক্কিহীনতা রয়েছে আমাদের প্যাকেজে। যারা থাকেন পেশাগত কাজে৷ তারাই আমাদের প্যাকেজগুলোতে অংশ নিয়েছেন। কসাই ঠিক করা, মাংস কাটা এবং তা সুন্দরভাবে প্যাক করে সরাসরি গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার পুরো দায়িত্ব আমাদের প্রতিষ্ঠানের। এখানে আছে স্বচ্ছতা ও সততা।
মিঠ বাজার এগ্রোর মালিক সাইফুল ইসলাম জানান, আমরা তিনজন মিলে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছি। আমাদের কার্যক্রম শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ নয়, ঈদের আগের দিন শরিকদের সশরীরে গরু দেখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি কেউ চাইলে গরু কেনার সময়ও উপস্থিত থাকতে পারছেন। তিনি বলেন আজকাল শরীকে কোরবানি দিতে গেলে অনেক বেশি খরচ পড়ে যায়। তাছাড়া মনের মতো শরিকদাতাও পাওয়া যায় না শহরে। কসাই থেকে শুরু করে মাংস কাটার কাজের শ্রমিকরা নানাভাবে ব্যস্ত হয়ে যায়। অনেকেই এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে হাঁপিয়ে ওঠে। তাই এসব ঝুঁকি ঝামেলা থেকে মুক্তি দিতে আমরা এসব প্যাকেজ চালু করেছি। এছাড়া সারা বছর প্রতি সপ্তাহে আমরা ন্যায্য মূল্যে কোরবানি মাংস বিক্রি করে থাকি।।
মিট বাজারে কুরবানি দেওয়া মিনহাজ উদ্দিন নামের এক গ্রাহক বলেন,শহরাঞ্চলে শরিকানায় কুরবানি দেওয়া একদিকে যেমন খরচ সাপেক্ষ, অন্যদিকে ভালো শরিক পাওয়াও মুশকিল। সব কাজ একাই সামলাতে হতো। কিন্তু এখানে এসে এক টাকাতেই সব ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়েছি।
এখন কথা বলেন সাংবাদিক শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, চাকরিজীবনের ব্যস্ততায় কোরবানি হাটে গিয়ে পশু ক্রয় করা, কামারশালায় দাঁ, ছুরি শান দেয়া, চাল গুড়ো করা, কসাই ঠিক করা, খাট্টাসহ গো খাদ্য কয় করা এবং পশুকে কয়েকদিন লাল পালন করা বেশ কষ্টের৷ অনেকের জন্য তা রীতিমতো অসম্ভবও। তাছাড়া পেশাদার কসাই পাওয়া না গেলে একটি গরু কোরবানি দিতেই সারাদিন চলে যায়। তাই এসব প্রতিষ্ঠান এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
ব্যস্ত নাগরিক জীবনে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা ঠিক রেখে সময় ও শ্রম বাঁচাতে চট্টগ্রামের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির মাঝে এই ব্যতিক্রমী ও আধুনিক কুরবানি ব্যবস্থাপনা দিন দিন আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

