চলন্ত গাড়িতে পাইপ নিক্ষেপ, থামলেই লুট

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বেড়েছে ডাকাতের দৌরাত্ম্য, আতঙ্কে জনজীবন

জহিরুল ইসলাম, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বেড়েছে ডাকাতের দৌরাত্ম্য, আতঙ্কে জনজীবন

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণপ্রবাহ ও ব্যস্ততম সড়ক ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশে বেড়েছে সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্রের দৌরাত্ম্য। গভীর রাতে একের পর এক ডাকাতি, চলন্ত গাড়িতে লোহার পাইপ ও ভারী বস্তু নিক্ষেপ করে গাড়ি থামিয়ে লুটপাট, পৌর সদরে ধারাবাহিক চুরি এবং মাদক কারবারিদের বেপরোয়া তৎপরতায় জনমনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি ডাকাতচক্র নতুন কৌশলে মহাসড়কে ত্রাস সৃষ্টি করছে। গভীর রাতে চলন্ত যানবাহন লক্ষ্য করে লোহার পাইপ, রড কিংবা ভারী বস্তু ছুড়ে মারা হচ্ছে। বিকট শব্দে আতঙ্কিত হয়ে চালক গাড়ি থামালেই আশপাশে ওত পেতে থাকা অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তরা মুহূর্তেই যাত্রীদের জিম্মি করে ফেলে। পরে নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে দ্রুত পালিয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

সবশেষ গত ৮ মে শুক্রবার গভীর রাতে উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের তুলাতুলী এলাকায় পুলিশের সদস্য বহনকারী একটি মাইক্রোবাসেও একই কায়দায় ডাকাতির চেষ্টা চালানো হয়। তবে গাড়িটিতে পুলিশ সদস্যরা থাকায় তারা তাৎক্ষণিক ধাওয়া দিলে ঘটনাস্থল থেকে এক ডাকাতকে আটক করা সম্ভব হয়।

এর একদিন পর ৯ মে শনিবার রাতে নুনাছড়া এলাকায় বিয়েবাড়ি থেকে ফেরার পথে হিন্দু অতিথিবাহী একটি মাইক্রোবাস ডাকাতির শিকার হয়। অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকার লুট করে নেয় দুর্বৃত্তরা। আতঙ্কিত যাত্রীরা জানান, পুরো ঘটনাটি কয়েক মিনিটের মধ্যেই সংঘটিত হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীদের অভিযোগ, মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোতে গভীর রাতে পর্যাপ্ত পুলিশি টহল না থাকায় ডাকাতচক্র দিনদিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নুনাছড়া, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা, বারআউলিয়া, ভাটিয়ারী ও ফৌজদারহাট এলাকার কয়েকটি অংশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ জোনে পরিণত হয়েছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব এলাকায় সাধারণ যানবাহন চলাচলেও আতঙ্ক কাজ করছে।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, শিল্পকারখানার কাঁচামাল পরিবহন এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগের বড় অংশই এই মহাসড়কনির্ভর। ফলে এখানে নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে থাকলে শুধু যাত্রীসেবাই নয়, জাতীয় অর্থনীতিও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এদিকে মহাসড়কে ডাকাত আতঙ্কের মধ্যেই সীতাকুণ্ড পৌর সদরে ধারাবাহিক চুরি, মাদক কারবারিদের বেপরোয়া তৎপরতা এবং কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার ও আশপাশের এলাকায় মাদকসেবী ও অপরাধীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

সীতাকুণ্ড বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, সীতাকুণ্ডে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। চুরি, ডাকাতি ও মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। পুলিশকে বারবার জানিয়েও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, গভীর রাতে উত্তর বাজার এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদকসেবীদের প্রকাশ্য বিচরণে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। সম্প্রতি পৌর সদরে পরপর পাঁচ দিনে থানার সামনে সিঙ্গার শোরুমের গ্রিল কেটে চুরির চেষ্টা ও সহকারী পুলিশ সুপার অফিসের সামনে আলীর দোকান এবং পৌর সদরে জাফর সদাগরের দোকানসহ একাধিক দোকানে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড থানার ওসি (তদন্ত) মো. আলমগীর হোসেন আমার দেশকে বলেন, সম্প্রতি সংঘটিত চুরি ও ডাকাতির ঘটনাগুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। মহাসড়ক ও পৌর এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে এবং অপরাধীদের শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটির পর একটি ডাকাতি, চুরি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পরও দৃশ্যমান ব্যবস্থা কবে নেওয়া হবে? দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়ক ও জনপদে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ফিরবে কবে, সেই প্রশ্ন এখন সর্বত্র।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন