রাউজানে নতুন আতঙ্ক আলম-আজিজ বাহিনী

রাউজানে নতুন আতঙ্ক আলম-আজিজ বাহিনী

চট্টগ্রামের রাউজানে এক অপরাধী গোষ্ঠীর সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর আরেক গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খুন, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অশান্ত এই উপজেলায় এবার আলোচনায় উঠে এসেছে জানে আলম ওরফে ডাকাত আলম এবং মোহাম্মদ আজিজ ওরফে আজিজ বসের অনুসারীরা। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে তাদের গ্রেপ্তারে অভিযানে গিয়ে গুলির মুখে পড়ে পুলিশ। এতে ১২ সদস্য আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দিলদার হোসেন (৩৭) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় আগ্নেয়াস্ত্র, ১১৯টি চায়না রাইফেলের গুলি ও দেশীয় অস্ত্র।

বিজ্ঞাপন

জেলা পুলিশের দাবি, শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সহযোগী রায়হান আলমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ধামা ইলিয়াস, মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনসহ কয়েকজন গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত ডাকাত আলম ও আজিজ বসের গোষ্ঠী এলাকায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। রায়হান নিজে এখনো পুলিশের নাগালের বাইরে।

এক পক্ষের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ ওঠায় রাউজানে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের হাতে যাচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

পুলিশের তথ্যানুযায়ী, গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাউজানের আবু বক্কর চৌধুরীর কাছে ফোনে চাঁদা দাবি করা হয়। পরে জানে আলম ও আজিজের অনুসারীরা তার বাড়ি গিয়ে হুমকি দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি যাচাই করে তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে রাউজান থানার ওসি সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল কদলপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ কদলপুর জয়নগর বড়ুয়াপাড়া এলাকায় অভিযান চালায়।

পুলিশের ভাষ্য, জানে আলমের বসতঘরের কাছে পৌঁছালে ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষায় পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। ওই সময় সেখানে জানে আলম, আজিজ বস, দিলদার হোসেন, রুবেল, মামুন-অর-রশিদ মামুন ও বাঁচাসহ কয়েকজন ছিলেন বলে দাবি পুলিশের। গুলিবিদ্ধ দিলদারকে গ্রেপ্তার করা হলেও বাকিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

জেলা পুলিশ জানায়, অভিযানে একটি দোনলা বন্দুক, একটি একনলা বন্দুক, ১১৯টি চায়না রাইফেলের গুলি, ছয়টি সিসা কার্তুজ, চারটি রামদা, দুটি কিরিচ ও গুলি রাখার পাউচ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদের মালিকানা এবং কোনো অপরাধে সেগুলো ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ।

পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, রায়হান ও তার প্রতিপক্ষের সদস্যদের একের পর এক গ্রেপ্তারের ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছিল। এর মধ্যে রায়হানপন্থিদের প্রতিপক্ষ ডাকাত আলম ও আজিজ বসের গোষ্ঠী সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলে খবর পান তারা। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এসপি জানান, গ্রেপ্তার দিলদারকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চক্রটির কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের ধারণা, তাদের কাছে আরো ভারী অস্ত্র থাকতে পারে। এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তী অভিযান চালানো হবে।

তিনি বলেন, কে কোন গ্রুপের, সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। যারা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

পুলিশ সুপার আরো জানান, অভিযানে আহত পুলিশ সদস্যদের হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।

কে এই ডাকাত আলম ও আজিজ বস

পুলিশের তথ্যানুযায়ী, জানে আলম ওরফে ডাকাত আলমের বয়স ৪২ বছর এবং মোহাম্মদ আজিজ ওরফে আজিজ বসের বয়স ৫২ বছর। পুলিশের দাবি, তাদের নেতৃত্বে কদলপুর ও আশপাশের এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা দাবি এবং সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগে তাদের নাম এসেছে।

পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে, এই গোষ্ঠীর কাছে একে-৪৭ রাইফেলসহ ভারী অস্ত্র রয়েছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, তাদের অনুসারীর সংখ্যা দেড় শতাধিক। তবে অস্ত্রের মজুত ও সদস্যসংখ্যার এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, ডাকাত আলম ও আজিজ বসের বিরুদ্ধে ডাকাতি ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গেও তাদের যোগাযোগের অভিযোগ আছে। স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর সঙ্গে তাদের ছবি রয়েছে। অতীতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তাদের দেখা গেছে।

পুলিশ রায়হান আলম ও তার অনুসারীদের সঙ্গে ডাকাত আলম-আজিজ বসের গোষ্ঠীর বিরোধকে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতা হিসেবে দেখছে। পুলিশের ভাষ্য, বালুমহাল ও চাঁদাবাজির অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে এই বিরোধের সূত্রপাত। রাউজানে বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ বালু উত্তোলন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় সংঘাতের অভিযোগ উঠেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন