প্রকৌশলীর কারসাজিতে যুবলীগ নেতার প্রতিষ্ঠানকে দেড়শ কোটি টাকার কাজ

প্রকৌশলীর কারসাজিতে যুবলীগ নেতার প্রতিষ্ঠানকে দেড়শ কোটি টাকার কাজ

লক্ষ্মীপুরের রামগতি-কমলনগর আঞ্চলিক মহাসড়কের প্রায় দেড়শ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা আবদুল হাইয়ের প্রতিষ্ঠান আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডকে অনৈতিকভাবে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে লক্ষ্মীপুর জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। রিমি নির্মাণ লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদুল হক সরকার লিড পার্টনার হিসেবে এ অভিযোগ তুলেছেন।

কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা আবদুল হাই স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের আমলে বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ ছাড়া স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ তার বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলাও হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। একাধিক সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় বিভিন্ন সময়ে জেলেও ছিলেন তিনি। তিনি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানার বদরপুর গ্রামের হাজী গুনাগাজী ব্যাপারী বাড়ির মো. ইউনূছ মিয়ার পুত্র। তিনি বর্তমানে ঢাকার পল্টন থানার শান্তিনগর এলাকার পীর সাহেবের গলিতে বসবাস করেন।

বিজ্ঞাপন

দরপত্র সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর-চর আলেকজান্ডার-সোনারপুর সড়কের কমলনগরের হাজিরহাট থেকে শুরু করে আলেকজান্ডারের আজাদনগর পর্যন্ত প্রায় ২৭ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে আড়াই ফুট প্রশস্তকরণের কাজের দরপত্র আহ্বান করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। ওই কাজটি যৌথ উদ্যোগে (জয়েন্ট ভেঞ্চার) আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও রিমি নির্মাণ লিমিটেডসহ অনেকেই দরপত্রে অংশগ্রহণ করেন। পরে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে একশ ৪৬ কোটি ৪৭ লাখ ১১ হাজার টাকায় যৌথ উদ্যোগে কাজটি পায় আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও রিমি নির্মাণ লিমিটেড। তখন প্রধান পার্টনার হিসেবে কাজের সব কার্যক্রম রিমি নির্মাণ লিমিটেডকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও লক্ষ্মীপুর জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা আবদুল হাইয়ের প্রতিষ্ঠান আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডকে বুঝিয়ে দেন এবং গত ১২ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কাজ করার অনুমতি প্রদান করেন।

বিষয়টি রিমি নির্মাণ লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল হক সরকারের নজরে আসলে তিনি যৌথ উদ্যোগের কাজের সব চুক্তি বাতিলের আবেদন করেন। চুক্তি বাতিলের কাগজপত্র এবং এককভাবে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ করার আদেশ না দিতে লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর আবেদনপত্র দেন। কিন্তু সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়মের তোয়াক্কা না করে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের পরিচালক ও যুবলীগের সদস্য মোহাম্মদ আবদুল হাইকে কাজের অনুমতি দেন। এতে চুক্তিপত্রের নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

এ বিষয়ে রিমি নির্মাণ লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়দুল হক সরকার বলেন, যৌথ উদ্যোগে চুক্তির মাধ্যমে সড়ক ও জনপথের দরপত্রে অংশগ্রহণ করে লক্ষ্মীপুর-আলেকজান্ডার-সোনারপুর সড়কের ২৭ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ পান তারা। চুক্তিতে থাকা আবদুল হাইয়ের প্রতিষ্ঠান আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড হঠাৎ উধাও হয়ে যায় এবং তাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে সড়ক ও জনপথের সঙ্গে সব চুক্তিতে লিড পার্টনার হিসেবে রিমি নির্মাণ লিমিটেড অংশগ্রহণ ও যোগাযোগ স্থাপন করে। যেহেতু আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তিতে যোগাযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাই কাজটির শুরু থেকে চলমান প্রক্রিয়া পর্যন্ত আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডকে জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগ একাধিকবার চিঠি ইস্যু করে। কিন্তু তারা কোনো ধরনের যোগাযোগ স্থাপন করেনি। কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব (পাওয়ার) দেওয়ার ঠিক ৪২ দিন অতিবাহিত হলেও আবদুল হাই যোগাযোগ করেননি। লিড পার্টনার হিসেবে রিমি নির্মাণ লিমিটেডের পক্ষ থেকে আমিও তার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হই। দুজনই তো পার্টনার হিসেবে কাজের জন্য আহ্বান করেছি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, আবদুল হাই ৫ আগস্টের পর একাধিক সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় জেলে ছিলেন। তিনি যে কেন্দ্রীয় যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এমন তথ্য গোপন রেখে চুক্তিতে কাজে অংশগ্রহণ করেন। তার সঙ্গে আমার বন্ধুর মাধ্যমে সম্পর্ক হলে সেও আমাকে বলেনি যে আবদুল হাই কেন্দ্রীয় যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বর্তমানে ফ্যাসিস্টের সঙ্গে পার্টনার হিসেবে ব্যবসা কে করবে?

তিনি আরও বলেন, যেহেতু আবদুল হাই নিরুদ্দেশ, তাই চুক্তিতে রিমি লিমিটেড জড়িত। কাজটি করতে আমি আদালতের আদেশ নিয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান নজরুল ইসলামকে চিঠি ইস্যু করি। কাজটি রিমি নির্মাণ লিমিটেড করতে আদালতের আদেশ নিয়েছি। হঠাৎ জানতে পারি, মো. নজরুল ইসলাম স্ট্যাম্প চুক্তির ভিত্তিতে অসৎভাবে আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের আবদুল হাইকে দিয়ে কাজটি করাচ্ছেন। যে ব্যক্তিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ চিঠি ইস্যু করে খুঁজে পাচ্ছে না, নিখোঁজ—সেই ব্যক্তি কীভাবে লিড পার্টনারকে বাদ দিয়ে চুক্তি ভঙ্গ করে কাজ করছেন? মোটা অঙ্কের বিনিময়ে জুলাই হত্যার আসামির সঙ্গে ডিল করে সরকারের মেগা প্রকল্পে অনৈতিক পথ অবলম্বন করে কাজ করছেন। এটা সত্যিই সূক্ষ্ম কারসাজি ছাড়া কিছুই নয়। ভয়ংকর নজির দেখালেন মো. নজরুল ইসলাম। অনৈতিক কাজের তদন্ত দরকার। তাছাড়া লিড পার্টনার হিসেবে কাজের মান খারাপ হলে রিমি নির্মাণ লিমিটেডের দায় কে নেবে? এমন প্রশ্নও তিনি করেন।

এদিকে আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আবদুল হাইয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, তারা যৌথ উদ্যোগে কাজ পাওয়ার পর ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে দুজনই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, অফিসের সব বিষয়ে আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের ডিল করবে। ব্যাংক এবং কাজের বিষয়ে আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড দেখবে। চুক্তিপত্রের নিয়ম অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। আমাকে অভিযোগে এনে কী লাভ? নিয়মমতো তারা কাজ করছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন