দাদার কোলে বসে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে ১৮ মাসের অবুঝ শিশু নাহিয়ান। কিছুক্ষণ আগেই ফোনে বাবার ছবি দেখছিল সে। ফোনের পর্দায় ভেসে থাকা মানুষটির মুখ খুব পরিচিত, যাকে সে আধো আধো বোলে ‘বাবা’ বলে ডাকতে শিখেছে। কিন্তু সেই অবুঝ শিশুটি এখনো জানে না—মোবাইলের ওপাশের মানুষটি আর কখনো ফিরবে না। তার ছোট্ট হাত দিয়ে কখনো আর পাওয়া হবে না বাবার উষ্ণ পরশ।
ঘরের এক কোণে বুক চাপড়ে আহাজারি করছেন মা, আর শয্যাশায়ী বৃদ্ধ বাবা রুহুল আমিনের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে বাঁধভাঙা অশ্রু। আদরের ছোট সন্তানের অকালমৃত্যুর খবরে স্তব্ধ তিনি। পুরো বাড়িজুড়ে এখন কেবলই শোকের মাতম আর স্বজনদের বুকফাটা কান্না।
ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে ওমানে পাড়ি জমানো চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের তরুণ নুর উদ্দিনের (৩২) সব স্বপ্ন তলিয়ে গেছে ওমান উপসাগরের অতল গভীরে। বৃহস্পতিবার সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর, রবিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় ওমান পুলিশের সহযোগিতায় তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সন্দ্বীপ উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বানার বাড়ির রুহুল আমিনের ছোট ছেলে নুর উদ্দিন। পরিবারের পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট হওয়ায় পরিবারের সবার প্রিয় ছিলেন তিনি। জীবিকার তাগিদে সাত বছর আগে তিনি ওমানে যান। সর্বশেষ ২০২৪ সালে দেশে এসে বিয়ে করেন। বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় আবারও জীবিকার প্রয়োজনে ফিরে যেতে হয় প্রবাসে। এর মধ্যেই জন্ম নেয় তাঁর একমাত্র সন্তান নাহিয়ান। দূর প্রবাসে বসে মোবাইল ফোনের ভিডিও কলেই সন্তানের বেড়ে ওঠা দেখতেন তিনি। কথা ছিল খুব দ্রুতই দেশে ফিরে সন্তানকে প্রথমবারের মতো সরাসরি বুকে জড়িয়ে নেবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বাবার সঙ্গে সন্তানের সরাসরি দেখা হওয়ার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
নুর উদ্দিন ওমানের একটি কোম্পানিতে (কপিল আহাম্মদ দুব্বা শেরকাত) কর্মরত ছিলেন। ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টায় ওমান উপসাগরের একটি ট্রলারে সহকর্মীদের সঙ্গে মাছ ধরতে যান। এ সময় অসাবধানতাবশত ট্রলার থেকে দুইজন সাগরে পড়ে যান। একজনকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও সাগরের উত্তাল স্রোতে তলিয়ে যান নুর উদ্দিন।
নুর উদ্দিনের বড় ভাই আকতার হোসেন ওমান থেকে মুঠোফোনে আমার দেশকে বলেন, ‘নিখোঁজের পর থেকেই সাগরে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে ওমান পুলিশ। রবিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় সাগরে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দেন স্থানীয় জেলেরা। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পরবর্তীতে মরদেহটি আমার ছোট ভাই নুর উদ্দিনেরই বলে শনাক্ত করা হয়।’ তিনি আরও জানান, আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষে দ্রুত মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে নুর উদ্দিনের এমন অকালমৃত্যুতে পরিবারজুড়ে চলছে মাতম। শেষবারের মতো তাঁর মুখটি একনজর দেখতে প্রহর গুনছেন শোকস্তব্ধ স্বজনরা।
সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। জীবিকার তাগিদে বিদেশে গিয়ে এভাবে তরুণ প্রবাসীর অকালমৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। লাশ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক যোগাযোগ ও সব ধরনের প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।’
প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক আতিকুল ইসলাম জানান, লাশ দ্রুত দেশে আনার আইনি প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

-a8aee5-720x405.webp)