চট্টগ্রাম বিভাগে ৪ মাসে ২৫১ খুন, ধর্ষণ ২৭৫

চট্টগ্রাম বিভাগে ৪ মাসে ২৫১ খুন, ধর্ষণ ২৭৫

চট্টগ্রাম বিভাগে গত ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ৪ মাসে ২৫১ জন খুন হয়েছেন, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৭৫ জন। চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে গত ১৭ এপ্রিল আইনশৃঙ্খলা কমিটির সর্বশেষ সভায় এই তথ্য জানানো হয়। প্রশাসন বলছে, সামাজিক সহিংসতা, মাদক, জমি সংক্রান্ত বিরোধ এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বই খুনের ঘটনা বৃদ্ধির কারণ। আর ধর্ষণের কারণ উদঘাটন করতে পারেনি প্রশাসন।

সভায় জানানো হয়, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চ মাসে বিভাগের সাত জেলায় খুনের ঘটনা বেড়েছে ৩০টি। ফেব্রুয়ারিতে খুনের ঘটনা ঘটে ৫৩ টি। জানুয়ারিতে ৫৪ জন ও ডিসেম্বরে ৫৯ জন খুন হন। মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি খুন হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়। এই জেলায় খুন ফেব্রুয়ারির ১৪ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫-এ। কক্সবাজারে খুনের সংখ্যা ১০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৬। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৪ থেকে বেড়ে ১০, ফেনীতে ১ থেকে বেড়ে ৩, লক্ষ্মীপুরে ১ থেকে ২, খাগড়াছড়িতে ০ থেকে ২ এবং বান্দরবানে ০ থেকে ২টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

তবে খুনের ঘটনায় তিনটি জেলায় হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে। কুমিল্লায় ১০ থেকে নেমে এসেছে ৭-এ, চাঁদপুরে ৭ থেকে ২ এবং নোয়াখালীতে ৫ থেকে ২-এ। এসব জেলায় মোট ১১টি খুনের ঘটনা কমেছে। রাঙামাটিতে খুনের সংখ্যা অপরিবর্তিত রয়েছে ১টি।

ধর্ষণের ঘটনার দিক থেকেও মার্চ মাসটি ছিল উদ্বেগজনক। চট্টগ্রাম বিভাগে ধর্ষণজনিত মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৯টি জেলায়, যেখানে সর্বমোট বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৩টি ঘটনা। কুমিল্লায় সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ থেকে ১৯। চট্টগ্রামে ২১ থেকে বেড়ে ২৮, কক্সবাজারে ৮ থেকে ১১, চাঁদপুরে ১ থেকে ৭, খাগড়াছড়িতে ০ থেকে ৬, লক্ষ্মীপুরে ৫ থেকে ৮, বান্দরবানে ১ থেকে ৪, রাঙামাটিতে ১ থেকে ২ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ০ থেকে ১।

ধর্ষণের ঘটনায় একমাত্র হ্রাস দেখা গেছে ফেনী জেলায় ৩ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১-এ। অপরদিকে, নোয়াখালীতে ধর্ষণের ঘটনায় কোনো পরিবর্তন হয়নি, আগের মতোই ৬টি রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা কমিটির কর্মকর্তারা বলেন, অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে। তবে অবিলম্বে কঠোর নজরদারি এবং আইনি পদক্ষেপ জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।

সভায় চট্টগ্রাম জেলায় খুনের বৃদ্ধির কারণ হিসেবে প্রশাসন জানায়, বেশিরভাগ খুন পূর্ববর্তী অপরাধের প্রতিশোধ বা এলাকার আধিপত্য নিয়ে সংঘটিত হয়েছে। পুলিশ, র‍্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত কাজের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, তবে কিছু এলাকায় বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ব্যাপক হারে।

ফেব্রুয়ারিতে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫২টি, যা মার্চে বেড়ে ৯৪টিতে পৌঁছে। উল্লেখ্য, জানুয়ারি মাসে ১৪৩ জন ও ডিসেম্বরে ৬২ জন ধর্ষণের শিকার হন। মার্চে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুর, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানসহ একাধিক জেলায় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। তবে ফেনী জেলায় ধর্ষণের ঘটনা কমেছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যাও বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে উদ্ধার হয়েছিল ২৭০টি অস্ত্র, যা মার্চে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭৪টিতে।

অন্য জেলার লাশ ফেলা হয় চাঁদপুরে

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ওই বৈঠকে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এক চিত্র। অপরাধীরা এখন জেলার সীমানা ব্যবহার করে অপরাধের প্রমাণ লোপাটে সক্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে চাঁদপুর জেলায় অন্য জেলার হত্যাকাণ্ডের লাশ এনে ফেলার অভিযোগ উঠেছে, যা স্থানীয় প্রশাসনকে বাড়তি চাপের মুখে ফেলেছে।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন জানিয়েছেন, সম্প্রতি জেলার কয়েকটি আলোচিত খুনের ঘটনা প্রকৃতপক্ষে চাঁদপুরে সংঘটিত হয়নি। বরং পাশের কোনো জেলা থেকে এনে পরিকল্পিতভাবে লাশ ফেলে রাখা হয়েছে। এতে করে অপরাধের আসল চিত্র আড়াল করা হচ্ছে এবং তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, চাঁদপুরকে প্রমাণ লুকানোর জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢাকা-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ধরে লাশ এনে ফেলে দেওয়া হয়, যাতে মনে হয় খুনটি এখানেই হয়েছে।’ এ অবস্থায় হাইওয়ে পুলিশের নজরদারি আরো বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

চাঁদপুর জেলা প্রশাসক আরো জানান, এই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে জেলার প্রবেশপথে পুলিশ চেকপোস্ট জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত চাঁদপুর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা ও ২০টি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের হয়েছে। গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার মাঝিরচর এলাকায় মেঘনা নদীতে একটি জাহাজে সাতজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে, যা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এই ঘটনায় জাহাজের মাস্টার গোলাম কিবরিয়া, ইঞ্জিন চালক সালাউদ্দিন, সুকানি আমিনুল মুন্সি, গ্রিজার আজিজুল ও মাজেদুল, রানা কাজী এবং লস্কর সবুজ শেখ নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, বিভাগে অপ্রীতিকর ঘটনা ও নাশকতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব সময় প্রস্তুত রয়েছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক, চোরাচালান ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরোধী কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় নিয়মিত তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগে আইনশৃঙ্খলার অবনতি যাতে না ঘটে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো সতর্ক থাকতে হবে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা পরিস্থিতি নাজুক করে তুলছে, যেগুলো কিছু মহল অপব্যবহার করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত তদারকি ও অভিযানের ওপর জোর দেন তিনি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন