মিরসরাইয়ে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চলে নগরায়ন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি। ৩৩ হাজার একরজুড়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পাঞ্চলে বিপুল মানুষের সমাগম ঘটলেও, সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও জরুরি চিকিৎসাসেবা অবকাঠামো। ফলে চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন এখানকার হাজারো শ্রমিক ও বিনিয়োগকারী। তবে শিল্পায়নের এই চোখধাঁধানো বিস্তারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি জরুরি চিকিৎসা সেবা। বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জন্য এখানে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল, বিশেষায়িত ট্রমা কিংবা বার্ন চিকিৎসাকেন্দ্র। ফলে যেকোনো বড় শিল্প দুর্ঘটনায় আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আশঙ্কাজনক অবস্থায় রোগীদের প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগিয়ে চলছে এই শিল্পাঞ্চল। বর্তমানে এখানে ১৭টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে এবং আরও ২৪টি কারখানা নির্মাণাধীন। বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক এখানে কর্মরত আছেন। শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে শ্রমিক আবাসন, বাজার, পরিবহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় আশপাশের ইছাখালী, কাটাছড়া, মিঠানালা, মঘাদিয়া, শাহেরখালী ও মায়ানী ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি এই জোনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। দ্রুত বদলে যাচ্ছে সাগরপাড়ের জনপদের চিত্র, বাড়ছে জনসংখ্যা ও নাগরিক সেবার চাপ।
চিকিৎসা সংকটের ভয়াবহ রূপ দেখা গেছে গত ২৮ সেপ্টেম্বর। ফার্স্ট ফার্মিক স্টিল লিমিটেডের কারখানায় ফার্নেসের গলিত লোহা ছিটকে চীনা প্রকৌশলীসহ চারজন দগ্ধ হন। চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইতিমধ্যে চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং, শ্রমিক শরিফুল ইসলাম ও মনির হোসেন মারা গেছেন। জুয়েল নামে অপর এক শ্রমিক এখনো চমেক বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর লড়ছেন। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে স্থানীয় পৌর হাসপাতালগুলোই প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে, আর সেখান থেকে চমেক হাসপাতালের দূরত্ব আরও ৬০ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পথেই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
শিল্প পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রায়সুল ইসলাম জানান, শিল্পাঞ্চলের বিশাল আয়তনের সাথে দুর্ঘটনাও বাড়ছে, তাই এখানে দ্রুত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা জরুরি। চমেক হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. প্রদীপ জানান, দগ্ধ বা আঘাতপ্রাপ্ত রোগীর ক্ষেত্রে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাছাকাছি ট্রমা ও বার্ন সেবা থাকলে মৃত্যুর হার অনেক কমানো সম্ভব।
বিনিয়োগকারী ও খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু চিকিৎসা নয়, শিল্পাঞ্চলের দীর্ঘ সড়কে ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, ট্রাফিক সংকেত, সিসিটিভি ও নিরাপত্তাচৌকি স্থাপন এখন সময়ের দাবি। তবে আশার কথা শুনিয়েছেন বেজার পরিচালক সালেহ আহমদ। তিনি জানান, উৎপাদন কার্যক্রমের পাশাপাশি কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


