দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে পদ্মার চরাঞ্চলের মানুষ

মো. সরোয়ার হোসেন মিঠু, শিবচর (মাদারীপুর)

দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে পদ্মার চরাঞ্চলের মানুষ

মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলগুলোতে বসবাসকারী মানুষের জীবন যেন এক অন্তহীন সংগ্রামের নাম। নদীভাঙন, দারিদ্র্য, অবকাঠামোর অভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে প্রতিদিন বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাদের। এখানে প্রতি দিন শুরু হয় অনিশ্চয়তা আর সংগ্রামের গল্প নিয়ে, আর শেষ হয় টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্লান্ত এক নিঃশ্বাসে।

এখানে রয়েছে রাস্তাঘাটের অভাব, বিদ্যুৎ সুবিধা না থাকা এবং বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। সর্বনাশা পদ্মার ভাঙনে ভিটেমাটি, বসতঘর, ফসলি জমি সব হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তারপর বছরের পর বছর অপেক্ষা—কবে আবার নদীর বুকে জেগে উঠবে পদ্মার বুকে নতুন চর, কবে গড়ে উঠবে নতুন বসতি। অনেকের এ অপেক্ষা ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হয়।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে জীবিকার প্রধান উৎস কৃষি ও মৎস্য হলেও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আয় অনিশ্চিত। বন্যা, খরা কিংবা আকস্মিক ভাঙনে মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়েন অনেক পরিবার। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও প্রায় নেই বললে চলে। গত বৃহস্পতিবার পদ্মার চর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের চিত্র। চরাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় কোনো পাকা রাস্তা নেই। নদী পারাপারের নৌকাই একমাত্র ভরসা। এতে করে অনেক সময় রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাতায়াত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

চর এলাকায় নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে থাকে। বর্ষাকালে প্রবল স্রোত আর অনেক সময়ে নৌকার অভাবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াতসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিচ্ছিন্ন চরগুলোতে প্রতি বছর নৌকাডুবির ঘটনাও ঘটে, প্রাণহানির শঙ্কা থাকে সবসময়। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই বাড়ে দুশ্চিন্তা। চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি ভেসে যায়, নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট দেখা দেয়।

মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা নতুন চরের তিন ইউনিয়ন চরজানাজাত, কাঁঠালবাড়ি, মাদবরের চরের বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্পগুলো এমন।

কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের লেদু চৌকিদারের কান্দি এলাকার রাজা মিয়া বলেন, আমাদের চরাঞ্চলের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে যোগাযোগব্যবস্থা। জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসাসেবার অভাবে সাধারণ রোগ অনেক সময় মারাত্মক আকার ধারণ করে। চরাঞ্চলের অধিকাংশ শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে তাদের পড়াশোনা কার্যত থেমে যায়। এতে করে ঝরে পড়ার হার বাড়ে উদ্বেগজনকভাবে।

এ এলাকার আজিজ মিয়া বলেন, আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই। রাস্তা নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই, এভাবেই জীবন কাটাচ্ছি। চরজানাজাত ইউনিয়নের সামাদ খাঁর কান্দি এলাকার বাসিন্দা কালাম বেপারি (৫৭) জানান, একসময় নিজের ফসলি জমি থাকলেও এখন সব নদীগর্ভে। তিনি বলেন, ‘আমরা যেন বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে বাস করি। পদ্মার ভাঙা-গড়া দেখতে দেখতে জীবন চলে যাচ্ছে। এখানে বেঁচে থাকা এক ধরনের সংগ্রাম।

আমাদের এখানে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার বসবাস করছি, যাদের অধিকাংশ নদীভাঙনের শিকার হয়ে ভূমিহীন হয়েছে। মাছ ধরা, কৃষিকাজ ও পশুপালন আমাদের প্রধান কাজ। পদ্মার চরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার চিত্রও অত্যন্ত নাজুক। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া অনিয়মিত হয়ে পড়ে। অনেক শিশু প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারে না। চরে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় সাধারণ রোগও অনেক সময় মারাত্মক হয়ে ওঠে।

এ সময় কলেজছাত্রী মিম আক্তার বলেন, ‘চর থেকে শিবচর সদরে গিয়ে ক্লাস করা খুবই কঠিন। নিয়মিত যেতে পারি না। পরিবারে সামর্থ্য থাকলে এখানে থাকতাম না।’

পদ্মার চরাঞ্চলের কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাইদ আহমেদ সৈয়দ বেপারি বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের জন্য টেকসই বাঁধ নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। তবে শিবচরের সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, পদ্মা নদীর মাঝে নতুন চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টেকসই অবকাঠামো, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার সম্প্রসারণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। অন্যথায় পদ্মার এ চরাঞ্চলের মানুষের দুর্দশা আরো দীর্ঘস্থায়ী হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন