শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখীপুরে এক হৃদয়বিদারক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিনের কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক তরুণীকে চুরির অপবাদ দিয়ে তার দুই ভাই-বোনসহ একটি ঘরে আটকে রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্যাতন, গাছে বেঁধে মারধর এবং মাথার চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে।
ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের পর থেকে ভুক্তভোগী পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় বাড়িঘর ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে বলেও দাবি করেছে।
ঘটনাটি ঘটে গত মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকালে ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখীপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাজী শরীয়তউল্লাহ কলেজসংলগ্ন এলাকায়। এ ঘটনায় ওই রাতেই ভুক্তভোগী তরুণীর মা ফাতেমা বেগম (৪১) সখীপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছৈয়ালকান্দি এলাকার মুদি দোকানদার আবুল মোল্লার ছেলে মনির মোল্লা (২৫) দীর্ঘদিন ধরে ফারিয়া আক্তারকে (১৮) উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন এবং বিভিন্ন সময়ে কুপ্রস্তাব দিতেন। স্থানীয়রা একাধিকবার তাকে সতর্ক করলেও অভিযোগ অনুযায়ী তিনি বিরত হননি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ঘটনার দিন সকালে ফারিয়া তার ছোট বোন মারিয়া আক্তার (১৩) ও ভাই ফাহিমকে (৭) নিয়ে বাজার করতে গেলে দোকানের সামনে আবারও আপত্তিকর প্রস্তাব দেন মনির। এতে প্রতিবাদ করলে তিন ভাই-বোনকে জোর করে দোকানের পাশের একটি বাড়িতে নিয়ে আটকে রাখেন। সেখানে ফারিয়াকে আলাদা কক্ষে নিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং ছোট দুই ভাই-বোনকে বেঁধে রাখা হয় বলে অভিযোগ।
তাদের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন জড়ো হলে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য চুরির অভিযোগ তোলা হয় বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবারের।
এরপর ফারিয়াসহ তিন ভাই-বোনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে ফারিয়ার মাথার চুল কেটে দেওয়া হয় এবং তাকে লাঞ্ছিত করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
খবর পেয়ে দুপুরের দিকে সখীপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
ভুক্তভোগী তরুণীর মা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমার মেয়েকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল মনির। সেদিন আমার সন্তানদের ওপর যে নির্যাতন করা হয়েছে, তা কোনো মা সহ্য করতে পারবে না। এখন মামলা করার পর উল্টো আমরা জীবন নিয়ে আতঙ্কে আছি। অভিযোগ তুলে নিতে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’
ফারিয়া আক্তার বলেন, ‘আমি কুপ্রস্তাবে রাজি হইনি বলেই আমার ওপর এমন নির্যাতন করা হয়েছে। আমাকে একটি কক্ষে নিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করা হয়। আমি চিৎকার করলে পরে চুরির অপবাদ দিয়ে গাছে বেঁধে মারধর করা হয় এবং মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
ভুক্তভোগীর বাবা ফারুক বেপারী বলেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আমার তিন সন্তানকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। এখন আমরা নিজেদের বাড়িতে থাকতে পারছি না। অভিযোগ তুলে নিতে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা গরিব মানুষ, প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচার চাই।’
ঘটনার সময় উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, ‘চিৎকার শুনে গিয়ে দেখি মেয়েটির কাপড় এলোমেলো, শরীরে ওড়না নেই। পরে তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে চুল কেটে দেওয়া হয়। ছোট দুই ভাই-বোনকেও রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। চুরির অভিযোগের কোনো বিশ্বাসযোগ্য কারণ আমাদের কাছে মনে হয়নি। বরং মেয়েটিকে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করার ঘটনা আমরা আগেও দেখেছি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মনির মোল্লা বলেন, ‘মারধরের অভিযোগ সঠিক নয়। তারা আমার দোকানে চুরি করেছিল। স্থানীয় লোকজন তাদের ধরে রেখেছিল। মাথার চুল অন্যরা কেটেছে। আমি এর সঙ্গে জড়িত নই।’ কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
ভিডিওতে দেখা যাওয়া অপর অভিযুক্ত আফসানা, ফৌজিয়া সরদার ও নিশি সরদার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোফাজ্জল হুসাইন বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করেছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্যাতনের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

-cb2b78.jpg)