আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নারায়ণগঞ্জে ইসলামপন্থি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ‘ইসলামি ভোট এক বাক্সে’ স্লোগান তুলে বিভিন্ন ইসলামপন্থি দল একসঙ্গে মাঠে নামলেও ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সে ঐক্য দেখা যাচ্ছে না। বরং দলগুলো নিজস্ব সাংগঠনিক অবস্থান থেকে পৃথক প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে ইসলামপন্থি ভোট একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা নির্বাচনেও প্রার্থী চূড়ান্ত করার কার্যক্রম চলছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, মেয়র পদেও ইসলামপন্থি দলগুলোর একাধিক প্রার্থী দেখা যেতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ জামায়াত আমির ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা জব্বার জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে বৃহত্তর স্বার্থে ইসলামপন্থি দলগুলো একসঙ্গে নির্বাচন করেছিল এবং ‘ইসলামি ভোট এক বাক্সে’ স্লোগানটি ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাস্তবতা ভিন্ন।
মাওলানা জব্বার বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সততা, জনসম্পৃক্ততা ও এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা বেশি গুরুত্ব পায়। জোট না থাকলেও ইসলামপন্থি ভোটাররা নিজেদের বিবেচনায় ভোট দেবেন। তবে একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোট বিভক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে।
অন্যদিকে, জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সক্রিয় হয়েছে খেলাফত মজলিস। দলটি ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম দুই দফায় ঘোষণা করেছে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আলোচনায় আসা দলের যুগ্ম মহাসচিব সিরাজুল মামুনকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিরাজুল মামুন বলেন, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাস্তবতা এক নয়। জাতীয় পর্যায়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য জোটের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিটি দল নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন যাচাইয়ের সুযোগ পায়।
তিনি আরো বলেন, ভোট কিছুটা বিভক্ত হতে পারে, তবে এটিকে তারা নেতিবাচকভাবে দেখছেন না। এতে জনগণ বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও কর্মসূচি মূল্যায়নের সুযোগ পাবে। জাতীয় ও আদর্শিক প্রশ্নে ইসলামপন্থি দলগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে অংশ নিলেও বৃহত্তর ইসলামপন্থি সমন্বয় প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির নারায়ণগঞ্জ মহানগর সভাপতি মুফতি মাসুম বিল্লাহ মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন মূলত ব্যক্তি ও এলাকার নেতৃত্বের পরীক্ষার জায়গা।
তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচন রাষ্ট্রীয় নীতি ও জাতীয় প্রশ্নের নির্বাচন। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্ভর করে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, জনসম্পৃক্ততা এবং এলাকার উন্নয়নে ভূমিকার ওপর। তাই এখানে প্রত্যেক দল নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের সুযোগ পায়।
ভোট বিভক্তির প্রসঙ্গে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ইসলামপন্থি দলগুলো আলাদাভাবে নির্বাচন করলে ভোট কিছুটা ভাগ হতে পারে। তবে এতে জনগণ প্রত্যেক দলের প্রকৃত জনসমর্থন সম্পর্কে ধারণা পাবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার সাংগঠনিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, সেটিও স্পষ্ট হবে।
নারায়ণগঞ্জে ইসলামপন্থি ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে ওই ভোট একত্রিত করার চেষ্টা দেখা গেলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগুলো নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করতে পৃথকভাবে মাঠে নামছে। ফলে সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইসলামপন্থি ভোটের সমীকরণ এবার ভিন্নরূপ নিতে পারে।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিস এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে নামলে ইসলামপন্থি ভোটের বড় অংশ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনি সমঝোতা হবে, নাকি দলগুলো স্বতন্ত্রভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

