কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য যাওয়ার পথে হৃদযন্ত্রে রিং পরানোর লক্ষাধিক টাকা ও মালামাল ছিনিয়ে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা। ছিনতাইকালে রিকশায় থাকা রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের এলোপাথাড়ি ছুরিকাঘাত ও মারধর করা হয়।
শনিবার সকালে ভৈরব শহরের পৌর কবরস্থানের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার শিকার হয়েছেন দক্ষিণ ভৈরবপুর এলাকার বাসিন্দা আমির আলী, তার স্ত্রী ও ছেলে। পরে স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
আহত আমির আলীর ছেলে ফারদিন খান পুলক জানান, আমার বাবা দীর্ঘদিন ধরে হার্টের সমস্যায় ভুগছেন। ডাক্তাররা রিং পরানোর পরামর্শ দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী সকালে এক লক্ষ টাকা নিয়ে রওনা দিই। কিন্তু ভৈরব রেলস্টেশনের কাছে পৌর কবরস্থানের সামনে পৌঁছামাত্র ওৎ পেতে থাকা ছয়জন ছিনতাইকারী রিকশার গতিরোধ করে।
তিনি আরো বলেন, তারা আমাদের ওপর ছুরি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। আমাদের মারধর করে দু‘টি ব্যাগে থাকা চিকিৎসার টাকা, তিনটি মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয়।
এদিকে এই ঘটনা জানাজানি হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় ওঠে। এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দেয়। তারা অভিযোগ করেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সকালবেলা এমন ছিনতাইয়ের ঘটনা ভৈরবের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ওইদিন বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে ছিনতাই প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ এনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বাসস্ট্যান্ড দুর্জয়মোড়ে প্রতিবাদ সভা করেন স্থানীয় কয়েকশ জনতা। সভায় বক্তব্য দেন মনিরুজ্জামান, আজহারুল ইসলাম, নূরে আলম, শাহরিয়ার মোস্তফা, মো. রিয়াদ, হান্নান আহমেদ, মো. জিহাদ, ভুক্তভোগী ফারদিন খান পুলক প্রমুখ।
এ সময় বক্তারা বলেন, আগে ভৈরবের ১ নম্বর সমস্যা ছিল মাদক। ভৈরবে মাদক কমেনি, বেড়েছে। তারপরও এখন ছিনতাইকে ভৈরবের ১ নম্বর সমস্যা ধরা হয়। ছিনতাই ইস্যুতে ভৈরবের ঘরে ঘরে আতঙ্ক। সমস্যা সমাধানে নাগরিক সমাজের নানা উদ্যোগেও প্রত্যাশিত ফল আসছে না। ফলে দিন দিন ছিনতাই না কমে, বরং বাড়ছে। আগে রাতে ছিনতাই হতো, এখন দিনেও হচ্ছে। প্রতিবছর ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে এক বা একাধিক ব্যক্তির মৃত্যুও হচ্ছে।
পরে তারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) জন্য শাড়ি ও চুড়ি নিয়ে আসেন এবং ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশকে তিন দিনের (৭২ ঘণ্টা) আলটিমেটাম দেন। এ সময় থানার ওসি খন্দকার ফুয়াদ রূহানী ও জ্যেষ্ঠ উপ-পরিদর্শক (এসআই) এমদাদুর রহমান বিক্ষুব্ধ জনতাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। আজাহারুল ইসলাম রিদম বলেন, ভৈরব শহরের কোনো সড়ক এখন আর নিরাপদ নেই। কেবল রাতে নয়, দিনেও লোকজন ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সর্বস্ব খোয়াচ্ছেন।
মনিরুজ্জামান বলেন, ছিনতাইকারীরা শুধু টাকা ও মালামাল নিয়ে শান্ত হচ্ছে না, সব দিয়ে দেওয়ার পরও ছুরিকাঘাত করে পথচারীদের রক্তাক্ত জখম করছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা পদে পদে দৃশ্যমান হচ্ছে। এ অবস্থায় ভৈরবে স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পুলিশ সক্রিয় থাকলে পরিস্থিতি এতটা নাজুক হতো না। পুলিশের ক্রমাগত ব্যর্থতার জন্যই উপহার হিসেবে ওসির জন্য শাড়ি ও চুড়ি নিয়ে আসা হয়েছে। ছিনতাই প্রতিরোধে ব্যর্থ হলে, ওসি যেন শাড়ি-ুচুড়ি পরে অফিস করেন। তিন দিনের ভেতর ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার ও পুরোপুরি ছিনতাই বন্ধ করতে না পারলে পুলিশের বিরুদ্ধে কঠিন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার ঘোষণা দেন তারা।
এদিকে শনিবার রাতভর ও আজ (৩ আগস্ট) রবিবার সকাল পর্যন্ত পুলিশি অভিযানে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২২ ছিনতাইকারীকে আটক করা হয়েছে। এরা হলো-সবুজ (২৩), হেলাল (২৫), নাঈম (২৩), রায়হান (২০), আরাফাত (৩৩), ওসমান (১৮), সোহেল মিয়া (২৮), মো. ফুল মিয়া (৩৬), হৃদয় (২৫), রনি মিয়া (৩২), বিল্লাল মিয়া (২০), সানি (৩৩), বিজয় (২৮), সুমন (২০), মাহিন (২১), নামিন (২০), মনির হোসেন (২৮), ফরহাদ (২৫), আকাশ (৩২), গোলাম মোস্তফা (৪২), জনি (২৬) ও দুলাল (৪৫)।
এই বিষয়ে ভৈরব থারার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) খন্দকার ফুয়াদ রূহানী বলেন, ছিনতাই বন্ধে আমাদের প্রচেষ্টা বরাবরের মতোই অব্যাহত আছে। এ ক্ষেত্রে তিনি স্থানীয় সচেতন মহলের আন্তরিক সহায়তা কামনা করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

