খুলনা মহানগরীতে ১৭ মাসে ৫১ খুন

কামরুল হোসেন মনি, খুলনা

খুলনা মহানগরীতে ১৭ মাসে ৫১ খুন

খুন, সন্ত্রাস ও মাদকের নগরীতে পরিণত হয়েছে খুলনা। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধ, পারিবারিক কলহ, রাজনৈতিক বিরোধ ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাসে মহানগরীর আট থানায় ১৬ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৪টি। এর আগে ২০২৫ সালে বছরজুড়ে কেএমপি এলাকায় ৩৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ গত ১৭ মাসে অন্তত ৫১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সে হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে তিনটি খুনের ঘটনা ঘটে।

বিজ্ঞাপন

চলতি বছরের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটে গত ৩০ মে রাতে। নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার তমিজ উদ্দিন সড়কের দারুস সালাম মহল্লার একটি ভাড়া বাসা থেকে বৃদ্ধা বেবী বেগম (৫৫), তার নাতি শামিম (১৩) ও মুস্তাকিমের (৪) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই পরিবারের তিন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পুরো খুলনায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশ। হত্যার পর থেকেই প্রধান সন্দেহভাজন রফিকুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন। নিহত শিশুদের বাবা মাছুম ব্যাপারী বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। স্থানীয়দের ধারণা, পারিবারিক কলহ ও বিদ্বেষ থেকেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হতে পারে।

কেএমপির সহকারী কমিশনার (অপরাধ) গোলাম মোহাম্মদ জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মহানগরীতে ১৬টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এতে ১৪টি মামলা হয়েছে।

তিনি জানান, চলতি বছর খুলনা সদর থানায় তিনটি, সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় একটি, লবণচরা থানায় দুটি, হরিণটানা থানায় একটি, খালিশপুর থানায় দুটি, দৌলতপুর থানায় তিনটি, আড়ংঘাটা থানায় একটি এবং খানজাহান আলী থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, ২০২৫ সালে কেএমপি এলাকায় ৩৭টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ওই সব ঘটনায় ৩৭টি মামলা হয়েছিল।

পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে ১৩টি ঘটে মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। এছাড়া পারিবারিক কলহে ছয়টি, প্রেমঘটিত কারণে দুটি, পরকীয়ার জেরে দুটি, ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে দুটি, ইজিবাইক চুরির ঘটনায় দুটি এবং বিভিন্ন কারণে বাকি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

কেএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে, তার অধিকাংশই মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে হচ্ছে। তিনি বলেন, একজন আরেকজনের সঙ্গে প্রতারণা করছে, পরে প্রতিশোধ হিসেবে হত্যাকাণ্ড ঘটছে। অনেক আসামি গ্রেপ্তারের পর জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, সন্ত্রাসীদের হাতে এখন অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে। পুলিশের কাছে অস্ত্র থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করার অনুমতি থাকে না। গ্রেপ্তার হওয়া সন্ত্রাসীরা দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডই আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ঘটছে।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু সম্প্রতি খুলনা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে শতাধিক খুন হয়েছে।

নদীতে লাশ ভাসছেÑএমন সংবাদও প্রকাশ হয়েছে।

তিনি বলেন, খুলনা মাদকে সয়লাব হয়ে পড়েছে। মাদকের বিস্তার বন্ধ করতে হবে। পুলিশ প্রশাসন কাজ করছে, বিভিন্ন এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। তারপরও হত্যাকাণ্ড থামছে না।

তিনি আরো বলেন, এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তাকে খুলনায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. সেলিনা আহমেদ বলেন, মানুষের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি সংস্কৃতির পরিবর্তনও অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির বড় একটি কারণ। আকাশ সংস্কৃতি, ইন্টারনেট ও মোবাইল প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে মানুষের জীবনধারা ও চিন্তাভাবনায় দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। এখন মানুষ খুব সহজেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চোখের সামনে দেখতে ও শুনতে পাচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে উৎসাহ জোগায়। আগে যে বিষয়গুলো নির্দিষ্ট বয়সের আগে জানার সুযোগ ছিল না, এখন বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাবে সেগুলো অল্প বয়সেই মানুষের সামনে চলে আসছে। এর ফলে মানুষের চিন্তা-চেতনা ও সামাজিক আচরণেও পরিবর্তন ঘটছে। সব মিলিয়ে সমাজে অস্থিরতা ও অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন