মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি স্বামী-স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা, পোড়ানো হয় লাশ

উপজেলা প্রতিনিধি, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি স্বামী-স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা, পোড়ানো হয় লাশ
নিহত নজরুল ইসলাম ও স্ত্রী কোহিনুর বেগম। ছবি: আমার দেশ

মালয়েশিয়ায় ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে বাংলাদেশি স্বামী-স্ত্রী দম্পতিকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। নিহতরা হলেন নজরুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী কোহিনুর বেগম। নজরুলের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার গোবরডাঙ্গা গ্রামে। তার বাবার নাম মোতালেব হোসেন। স্ত্রী কোহিনুরের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার সেনপাড়া গ্রামে। তার বাবার নাম আব্দুল করিম।

পরিবারের অভিযোগ, ১৪ এপ্রিল রাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাদের হত্যা করা হয় এবং পরে লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়। ঘটনার কয়েকদিন পর প্রবাসীদের মাধ্যমে ঘটনাটি জানজানি হয়।

বিজ্ঞাপন

নিহত নজরুলের পরিবার জানায়, ২০১৮ সালে জীবিকার সন্ধানে মালয়েশিয়ায় যান নজরুল। সেখানে তিনি একটি খামার গড়ে তোলেন। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ বিভিন্ন প্রাণী পালন করতেন। পরিবারের দাবি, স্থানীয় এক ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

নিহতের বড় ভাই জানান, নজরুলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক সমস্যা চলছিল এবং তাকে একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। নজরুল দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং খামারের সম্পদ বিক্রি করে সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছিলেন।

নিহতের ভাগ্নি বলেন, মামা তাকে জানিয়েছিলেন দ্রুত দেশে ফিরে আসবেন এবং অনেক কিছু নিয়ে আসবেন। এখন তিনি ন্যায়বিচার ও মরদেহ ফেরত পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় থাকা অবস্থায় নজরুলের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় হয় কোহিনুর বেগমের। ধারণা করা হচ্ছে, পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর নজরুলকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে কোহিনুর একাই মালয়েশিয়ায় চলে যান। প্রায় দেড় মাস আগে সেখানে গিয়ে নজরুল ইসলামকে বিয়ে করেন কোহিনুর। একসঙ্গে বসবাস করতে থাকেন দুজন।

পরিবারের লোকজন বলছেন, নজরুল ইসলাম মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রথমে পামবাগানে কাজ শুরু করেন। সেখানে বড় ধরনের সমস্যার কারণে তিনি বেশ কিছুদিন পালিয়ে ছিলেন। কোনো কাজ না পেয়ে অবশেষে এক ব্যবসায়ীর গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি ও কুকুর-বিড়ালের ফার্মে চাকরি নেন। প্রায় ৪ বছর পর নজরুল ইসলাম নিজেই আলাদা ফার্ম গড়ে তোলেন। পাশাপাশি তিনি চাকরিও করতেন।

অল্প দিনেই নজরুলের ব্যবসায় ব্যাপক সফলতা আসতে শুরু করে। কিন্তু শুরু হয় মালিকের সঙ্গে বড় ধরনের ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্বের কারণে চলতি বছর ১৪ এপ্রিল রাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নজরুল ও কোহিনুরকে হত্যার পর তাদের দুজনের লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

নজরুলের বড় ভাই জহির রহমান বলেন, নজরুলের কাছ থেকে তার মালিক বেশ কিছু টাকা ধার নেন। নজরুল আমাদের আগেই বলেছিল যে তার মালিকের সঙ্গে ব্যবসা নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব চলছে এবং ধার নেওয়া টাকা দিচ্ছে না। নজরুল আলাদাভাবে ব্যবসা শুরু করার কারণে তার মালিক তা মেনে নিচ্ছিল না। পরিবারের লোকজন এসব জানার পর তাকে বলেছিলাম, সব ছেড়ে দিয়ে দেশে চলে আসতে। কিন্তু ব্যবসার মালামাল ও ফার্ম বিক্রি করতে সময় লাগবে এমনটাই জানিয়েছিল।

নজরুলের বোন শাপলা খাতুন জানান, আমার ভাই খুব কষ্ট করে বড় হয়েছে। পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। ভাই বলতো, আপা, আর কষ্ট করতে হবে না। আমি বিদেশে গিয়ে পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবো। নিহতের বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে। ছেলের মৃত্যুর খবরে মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন, বাবা নির্বাক হয়ে পড়েছেন, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

নিহত কোহিনুরের ভগ্নিপতি আলমগীর হোসেন বলেন, বাংলাদেশে কোহিনুরের আগে বিয়ে হয়েছিল। আগের স্বামীর দিকের দুটি সন্তান রয়েছে। সে আমাদের কাউকে না জানিয়ে একাই মালয়েশিয়ায় গেছে। কবে কখন গেছে, আমরা কিছুই বলতে পারি না। পরিবারের লোকজনসহ আমরা প্রায় দেড় মাস তার কোনো সন্ধান পাচ্ছিলাম না। এখন শুনছি, সে মালয়েশিয়ায় গিয়ে খুন হয়েছে।

কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জেল্লাল হোসেন জানান, ঘটনাটি বিদেশে সংঘটিত হওয়ায় আমাদের কাছে সরাসরি কোনো তথ্য আসেনি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দূতাবাস ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে।

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন