আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে লাল ডাকবাক্স

কাজী মৃদুল, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ)

আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে লাল ডাকবাক্স
ছবি: সংগৃহীত

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার ব্যস্ততম সড়কের পাশে অবহেলায় জরাজীর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লাল ডাকবাক্স। এমন এক সময় যখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লাল ডাকবাক্স মানুষের আবেগ, অপেক্ষা আর যোগাযোগের অন্যতম ভরসা ছিল। প্রিয়জনের খবর, চাকরির আবেদন, ঈদের শুভেচ্ছা কিংবা দূর দেশে থাকা প্রিয়জন বা সন্তানের চিঠি সবকিছুর নীরব সাক্ষী ছিল এই লাল ডাকবাক্সগুলো। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে আজ সেই লাল ডাকবাক্সগুলো যেন হারিয়ে গেছে মানুষের জীবন থেকে।

শহর থেকে গ্রাম অনেক জায়গাতেই এখনো দেখা মেলে পুরোনো কিছু ডাকবাক্সের। তবে সেগুলোর বেশিরভাগই এখন অবহেলায় পড়ে আছে। কোথাও মরিচা ধরা, কোথাও রঙ উঠে গেছে, আবার কোথাও ময়লা-আবর্জনার পাশে অসহায়ের মতো জরাজীর্ণ শরীরে দাঁড়িয়ে আছে অতীতের স্মৃতি হয়ে। অনেকেই ভুলে গেছেন শেষ কবে এসব ডাকবাক্সে তাদের চিঠি ফেলে ছিলেন। এক সময় ডাকপিয়নের সাইকেল বেলের টিং টিং শব্দ শুনলেই মানুষের মনে আনন্দের ঢেউ উঠত। হাতে লেখা চিঠির প্রতিটি শব্দে থাকত ভালোবাসা, অনুভূতি আর আন্তরিকতার ছোঁয়া। এখন সেই জায়গা দখল করেছে মোবাইল ফোন, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক । মুহূর্তেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ফলে চিঠি লেখার সংস্কৃতি আর নেই বললেই চলে। এছাড়া ইন্টারনেটের যুগে পোস্ট অফিসের অন্যান্য কার্যক্রম চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

বিজ্ঞাপন

কোটচাঁদপুরের কৃতী সন্তান বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ইউনুস আলী মোল্লা বলেন, ডাকবাক্স দেখলেই মনে পড়ে যায়, জীবনের নানা স্মৃতি। তিনি আরো বলেন, কেউ অপেক্ষা করতেন প্রিয় মানুষের চিঠির জন্য, কেউবা চাকরির নিয়োগপত্রের আশায় দিনের পর দিন তাকিয়ে থাকতেন ডাকপিয়নের পথের দিকে। আজকের প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানেই না, এই লাল ডাকবাক্সগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক সময়ের মানুষের হাসি-কান্না ও অনুভূতির ইতিহাস।

কোটচাঁদপুর শহরের সত্তরোর্ধ্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা তমিজ উদ্দীন আমার দেশকে বলেন, এসব ডাকবাক্স শুধু একটি যোগাযোগেরমাধ্যম ছিল না, এগুলো ছিল দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তাই ইতিহাসের এই নীরব সাক্ষীগুলোকে সংরক্ষণ করা জরুরি। আধুনিকতার এই যুগেও পুরোনো স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সময়ের পরিবর্তনে হয়তো চিঠির ব্যবহার কমেছে, কিন্তু রাস্তার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা লাল ডাকবাক্সগুলো এখনো মানুষের অনুভূতির নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এভাবে আর কতদিন। অযত্নে-অবহেলায় জরাজীর্ণ লাল ডাকবাক্সের শরীর দিনে দিনে খসে খসে পড়ছে। একদিন হয়তো মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। পুরোনো ঐতিহ্য হবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কল্পকাহিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন