বাগেরহাটের রামপালে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় এক পরিবারের ৯ জনসহ ১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় মোংলার শেহালাবুনিয়া গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বাড়ির সামনে এখনো পড়ে আছে মসজিদ থেকে আনা কয়েকটি খাটিয়া, আঙিনাজুড়ে গভীর নীরবতা। মাঝে মাঝে সেই নীরবতা ভেঙে উঠছে স্বজনদের কান্নার শব্দে।
কেউ কবরস্থানে গিয়ে প্রিয়জনদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করছেন, কেউ আবার নিঃশব্দে কাঁদছেন। ভেজা মাটিতে হাত বুলিয়ে যেন বিশ্বাস করতে চাইছেন—যাদের নিয়ে ছিল হাসি, আনন্দ আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন, তারা আজ চিরনিদ্রায় শায়িত।
গত বৃহস্পতিবারের ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৪ জন। তাদের মধ্যে একই পরিবারের ৯ সদস্যকে শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়। শনিবার দিনভর শেহালাবুনিয়ার সেই বাড়িটিতে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় ছিল। তবে কোথাও স্বাভাবিক কোনো কোলাহল নেই—চারদিকে শুধু শোকের ভারী আবহ আর কান্নার রোল।
শনিবার বেলা ১১টার দিকে দুর্ঘটনায় নিহত নববধূ মিতুর বাবা আব্দুস সালাম মোড়ল খুলনার কয়রা উপজেলার নিজ বাড়ি থেকে মোংলা কবরস্থানে আসেন। মেয়ের নতুন সংসার নিয়ে তাঁর ছিল অনেক স্বপ্ন। মেয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে। আমার দুটি মেয়েই হারিয়ে গেল। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।”
তার এই হৃদয়বিদারক আহাজারিতে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনদের কান্না আরও বাড়ে। একে একে সবাই এসে প্রিয়জনদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলছেন।
কবরস্থানের এক কোণে নিঃশব্দে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন আশরাফুল রহমান জনি। এই দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন তাঁর স্ত্রী, তিন সন্তানসহ পরিবারের ৯ জন সদস্যকে। এত বড় শোকের পর যেন তাঁর কান্নাও শুকিয়ে গেছে।
স্বজনদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার সময় পরিবারের সদস্যদের মাইক্রোবাসে তুলে দিয়ে জনি নিজে মোটরসাইকেলে করে আসছিলেন। কিন্তু কিছু দূর এগোতেই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাস থেকে একে একে উদ্ধার করা হয় তাঁর স্ত্রী, তিন সন্তান, বাবা, ভাই, বোন এবং ভাগনে-ভাগনির লাশ।
অসীম যন্ত্রণা বুকে চেপে জনি বলেন, “আমাদের আর কিছু বলার নেই। সব শেষ হয়ে গেছে। তবে সরকারের কাছে অনুরোধ, খুলনা-মোংলা মহাসড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এই সড়ক এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।”
স্থানীয়রা জানান, দুর্ঘটনার পর থেকে পুরো শেহালাবুনিয়া গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রতিটি বাড়িতে চলছে নিহতদের স্মৃতিচারণ। কেউ বলছেন শেষ দেখা হওয়ার কথা, কেউ স্মরণ করছেন তাদের সঙ্গে কাটানো আনন্দময় মুহূর্ত।
গ্রামের প্রবীণদের ভাষ্য, একসঙ্গে এতগুলো লাশ এবং একই পরিবারের এতজনের মৃত্যু তারা জীবনে খুব কমই দেখেছেন। এ দৃশ্য গোটা এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, খুলনা-মোংলা মহাসড়কে দীর্ঘদিন ধরে বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চলাচল করছে। দ্রুত গতি নিয়ন্ত্রণ, সড়কে নজরদারি বৃদ্ধি এবং কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

