জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাবের কারণে উপকূলীয় জনপদ কয়রা উপজেলার প্রায় ৯৭ শতাংশ পরিবার চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততার প্রভাবের পাশাপাশি দুর্বল অবকাঠামো, অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা, লিঙ্গ বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের দু’জন শিক্ষকের গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। বুধবার (৮এপ্রিল) খুলনার সিএসএস আভা সেন্টারে অনুষ্ঠিত মিডিয়া সংলাপের মাধ্যমে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। কয়রা এলাকার নারী ও মেয়েদের দুর্যোগ ঝুঁকি বিষয়ে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন বিষয়ক এ সংলাপে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন ও প্রভাষক মো. রিমু মিয়া। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেজেএস’র সমন্বয়কারী (পরিল্পনা) নাজমুল হুদা।
গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে বলা হয়, কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশী ও সদর ইউনিয়নের ৩৮৩টি পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়। পাশাপাশি ১২টি ফোকাস গ্রুপ আলোচনা এবং ১২টি কী ইনফরমেন্ট সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়রার মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি লবণাক্ততা (৮৪.৯%) ও ঘূর্ণিঝড় (৭৪.৭%)। বিশেষ করে মে ও নভেম্বর মাসে এই ঝুঁকি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৫ শতাংশ মানুষ এখনো কাঁচা ঘরে বসবাস করে এবং ৬০.৩ শতাংশ ঘরের উঁচু ভিত্তি নেই, যা বন্যার সময় বড় ঝুঁকি তৈরি করে। দুর্যোগের পর ৮২.৮ শতাংশ মানুষ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে, ফলে জরুরি সহায়তা পেতে বিলম্ব হয়।
লিঙ্গভিত্তিক ঝুঁকিও প্রকটভাবে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ৮৯.৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, সাইক্লোন শেল্টারে নারীদের জন্য নিরাপদ ও আলাদা স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। এতে হয়রানির আশঙ্কায় অনেক নারী আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন।
দুর্যোগের এক সপ্তাহের মধ্যেই ২৫ শতাংশ পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে। জীবিকা হারিয়ে ৭৫ শতাংশ পরিবার ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যার বড় অংশই উচ্চ সুদের ঋণ।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৭৫.৭ শতাংশ মানুষ ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সম্পর্কে জানেন না।
ইউনিয়ন ভালনারেবিলিটি ইনডেক্স অনুযায়ী, দক্ষিণ বেদকাশী (৪৭.২৪) সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে রয়েছে কয়রা সদর (৩৮.৭৪)।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়ড়ার এই সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, ম্যানগ্রোভ বনায়ন, লবণমুক্ত পানি সরবরাহ, নারী-সংবেদনশীল আশ্রয়কেন্দ্র এবং কমিউনিটি ভিত্তিক অর্থনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা জাগ্রত যুব সংঘ (জেজেএস) ও জাপানের শাপলা নীড়ের এবং জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত প্রস্তুতি প্রকল্পের আওতায় গবেষণা পরিচালিত হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

