কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত অক্ষর সৌভিক রায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুরে খুলনা মহানগরীর রূপসা মহাশ্মশানে তার দাহ সম্পন্ন হয়। এর আগে বেলা ১১টার দিকে অক্ষরের মরদেহ লোয়ার যশোর রোডের ভাড়া বাসায় পৌঁছালে সেখানে শোকের মাতম নেমে আসে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে মা ও দুই বোন ভেঙে পড়েছেন।
নিহতের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, মা ও দুই বোন—মেধা মৃত্তিকা রায় ও শীর্ষা রায়সহ স্বজনরা শোকে স্তব্ধ। তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না। অক্ষরের মুখাগ্নি করেন তার ছোট বোন শীর্ষা রায়।
অক্ষর ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন অক্ষরের ভগ্নিপতি মো. আলিমুশ্বান সিফাত। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি।
সোমবার সাংবাদিকদের আলিমুশ্বান সিফাত বলেন, “চরম অব্যবস্থাপনার কারণেই আমার শ্যালকের মৃত্যু হয়েছে। যে সৈকতে তিনি নেমেছিলেন এবং যে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করা হচ্ছিল, সেটি অবৈধ ছিল বলে সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে। এরপরও কীভাবে সেটি পরিচালিত হচ্ছিল, সেটাই বড় প্রশ্ন।”
তিনি বলেন, “মানুষ আনন্দ ও বিনোদনের জন্য কক্সবাজারে যায়। সেখানে পর্যটনসেবার অংশ হিসেবে বিভিন্ন বিনোদনের আয়োজন থাকবেই। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হলে এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।”
তিনি আরও জানান, অক্ষরের মৃত্যুর ঘটনায় প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পরিবারের প্রধান দাবি রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ। তাঁর ভাষায়, “শুধু কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই দায় শেষ হয় না। পর্যটনকেন্দ্রে ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন পরিচালনায় অনুমোদন, তদারকি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।”
আলিমুশ্বান সিফাত বলেন, জেলা প্রশাসন বা পর্যটন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা করার সুযোগ না থাকায় আপাতত সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে পরবর্তী সময়ে আরও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অক্ষরের স্কুলবন্ধু রিফাত হাসান শুভ বলেন, “প্রত্যেকটি প্রাণের মূল্য আছে। আমরা জীবনের মূল্য চাই। অক্ষর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। এখন তাঁর মা ও দুই বোন কীভাবে চলবেন, সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।”
রিফাত জানান, গত ৩১ জুলাই ছিল অক্ষরের বাবার জন্মদিন। সেদিন প্রয়াত বাবাকে স্মরণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করেছিলেন অক্ষর। এর পরদিনই দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।
আরেক বন্ধু মোস্তফা আমিন তনু বলেন, “ঘটনার আগের দিনও অক্ষরের সঙ্গে কথা হয়েছিল। পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুর মৃত্যুর ভিডিও দেখতে হয়েছে। আমার বন্ধু আর কখনও ফিরে আসবে না।” তিনি অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের আচরণেও তাঁরা হতাশ হয়েছেন।
স্বজনরা জানান, পরিবারের একটি নিজস্ব বাড়ি থাকলেও সেটি বিক্রি করে বর্তমানে লোয়ার যশোর রোডের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন তাঁরা। অক্ষরের আয়ের ওপরই পরিবারের প্রধান ব্যয় নির্বাহ হতো। তাঁর মৃত্যুর পর সেই আয়ের উৎসও বন্ধ হয়ে গেছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বন্ধুদের সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে প্যারাসেইলিং করার সময় অক্ষর সৌভিক রায়ের ব্যবহৃত প্যারাসুট ছিঁড়ে যায়। এতে তিনি সাগরে পড়ে স্রোতে ভেসে যান। পরে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

