যশোরে কোনো কেন্দ্রেই টিকা নেই, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশুরা

আহসান কবীর, যশোর

যশোরে কোনো কেন্দ্রেই টিকা নেই, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশুরা
যশোর জেনারেল হাসপাতালের টিকাদান কেন্দ্র। ছবি: আমার দেশ

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় থাকা জীবন রক্ষাকারী টিকার তীব্র সংকট চলছে যশোরে। ফলে জেলায় ৭৩ হাজারের বেশি শিশু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে। টিকা না পেয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ফিরে যাচ্ছেন অভিভাবকরা। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। টিকা এলেই সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো হবে।

জানা গেছে, যশোরে দুই হাজার ২৮৩টি অস্থায়ী এবং আটটি স্থায়ী টিকাদান কেন্দ্র রয়েছে। এর কোনোটিতেই এখন টিকা নেই।

বিজ্ঞাপন

শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি যেমন বাড়বে, তেমনি কোনো কোনো শিশুকে ভবিষ্যতে পঙ্গুত্বের মতো ভয়াবহ পরিণতি বরণ করতে হতে পারে।

সময়মতো টিকা দিতে না পারলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে এবং তারা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে জানান কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রেহেনেওয়াজ রনি।

স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবমতে, গত তিন মাসে যশোর জেনারেল হাসপাতাল, সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং দুটি বেসরকারি ক্লিনিকে এক হাজার ৭২২ শিশু জন্ম নেয়। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত যশোর জেনারেল হাসপাতালে ৬০৯ জন, শার্শার বুরুজবাগান স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৩৭, ঝিকরগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২৩, চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১৫, অভয়নগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২২, মণিরামপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২২, বাঘারপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১৬ এবং কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১৬ শিশু জন্ম নেয়। এছাড়া দুটি বেসরকারি ক্লিনিকে ২৬২ শিশু জন্ম নেয়। জেলায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় রয়েছে ৫৯ হাজার ৮৭৩ শিশু। এর বাইরে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং বাসাবাড়িতেও নবজাতক জন্ম নিয়েছে, যার পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে নেই। এসব শিশু এখন পর্যন্ত ইপিআই টিকা পায়নি।

যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ঘোপেরডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা সানজিদা আক্তার জানান, তার দুই মাস বয়সি নাতিকে বসুন্দিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা দেওয়ার জন্য নিয়ে যান কয়েকবার। কিন্তু কেন্দ্র থেকে প্রতি মাসে বলা হয় আগামী মাসে যেতে।

সদর উপজেলার জিরাট গ্রামের আবুবক্কর জানান, গত ৫ মে যশোর জেনারেল হাসপাতালে তার ছেলের বউ কন্যাসন্তান জন্ম দেয়। শিশুকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইপিআই কেন্দ্র থেকে বিসিজি টিকা দিতে বলেন চিকিৎসক। কিন্তু সংকট থাকায় এখন পর্যন্ত শিশুটিকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

ভুক্তভোগী অভিভাবকরা বলছেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় টিকার দেখা মিলছে না। দায়িত্বরত স্বাস্থ্যকর্মীরা সরবরাহ না থাকার কথা বলে শিশু ও অভিভাবকদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন। বেসরকারিভাবে এসব টিকা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে শিশুদের সুরক্ষা। তাই টিকার সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক। বিপজ্জনক এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকা সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি অভিভাবকদের।

যশোর সদর উপজেলার স্বাস্থ্যকর্মী (এমটিপি) ওহেদুজ্জামান সুমন বলেন, টিকা শেষ হয়ে গেছে কয়েক মাস হলো। জেলা ইপিআই কেন্দ্রে চাহিদা পাঠিয়েছি। কিন্তু এখনো সরবরাহ আসেনি। ফলে শিশুদের টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

চৌগাছার স্বাস্থ্যকর্মী নিত্যপদ পাল বলেন, গত তিন মাস থেকে পর্যায়ক্রমে ইপিআই টিকা শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে আইভিপি ছাড়া কোনো টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জেলা ইপিআই কেন্দ্রে চাহিদা পাঠিয়েছি। সরবরাহ পেলে নতুন করে শিশুদের টিকা দেওয়া সম্ভব হবে।

যশোর মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. মাহাবুবুর রহমান ও শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মাহফুজুর রহমানের মতে, নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে হাম, পোলিও এবং নিউমোনিয়ার মতো মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। সঠিক সময়ে ডোজ সম্পন্ন না করলে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি যেমন বাড়বে, তেমনি ভবিষ্যতে পঙ্গুত্বের মতো ভয়াবহ পরিণতি বরণ করতে হতে পারে।

যশোর সিভিল সার্জন অফিসের ইপিআই টিকা স্টোরের রেজিস্টার খাতার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইপিআইভুক্ত টিকার মধ্যে গত ১০ মার্চ বিসিজির (যক্ষ্মা) টিকা শেষ হয়ে গেছে, ২৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে পিসিভি (নিউমোনিয়া) ও পেন্টাভ্যালেন্ট (পাঁচ রোগের প্রতিষেধক), ওপিভি ও আইপিভি (পোলিও) টিকা শেষ হয়েছে ১০ মার্চ, ১৪ এপ্রিল এমআর (হাম ও রুবেলা) এবং গত বছরের নভেম্বরে টিসিভি (টাইফয়েড) টিকা শেষ হয়ে গেছে।

যশোর সিভিল সার্জন অফিসের ইপিআই কর্মসূচির তত্ত্বাবধায়ক রবিউল ইসলাম জানান, স্টোরের সব টিকা শেষ হয়ে গেছে। কেন্দ্রে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এ টিকা যশোর স্টোরে পৌঁছালে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব কেন্দ্রে সরবরাহ করা হবে।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েত বলেন, হাসপাতালে গত ১৫-২০ দিন ধরে ইপিআই টিকা নেই। তবে অন্য যে টিকা আছে, সেগুলো দেওয়া হচ্ছে। দ্রুত ইপিআই টিকা সরবরাহ নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, টিকা চেয়ে কেন্দ্রে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এখনো টিকা এসে পৌঁছায়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন