লিফট ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ

ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন, পদদলিত হয়ে ৬ জনের মৃত্যু

ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন, পদদলিত হয়ে ৬ জনের মৃত্যু
ছবি: ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মমেক) অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, নিহতদের মধ্যে অজ্ঞাতপরিচয় এক শিশুও রয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।

পুলিশ জানায়, সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় শিশু ওয়ার্ডে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত নিচে নামার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু হয়। এ সময় পদদলিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন-নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বসী গ্রামের হাজেরা বেগম (৫০), ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া গ্রামের শাহজাহান (৪০), একই উপজেলার রমজান (৩৮) ও জাহানারা (৫০), এবং তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুমা (৩৫)। নিহত অপরজন অজ্ঞাতপরিচয় শিশুর পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

নিহত কুলসুমার ননদ নাজমা বেগম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আগুন লাগার পর তাড়াহুড়ো করে নিচে নামার সময় কুলসুমা মারা যান। পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতাল থেকে তার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন আমার দেশকে জানান, হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলার ছাদে অবস্থিত ১১ নম্বর লিফটের কন্ট্রোল রুমে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক মেশিনে অতিরিক্ত তাপ (ওভারহিট) অথবা শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী, স্টাফ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবনে প্রয়োজনীয় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

ময়মনসিংহ সদর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার জুলহাজ উদ্দিন বলেন, আগুন লাগার খবর পেয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফায়ার স্টেশনের একটি ইউনিট প্রথমে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে সদর ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য ইউনিট সেখানে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ভবনের ভেতরে প্রচণ্ড ধোঁয়া জমে যায়।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান জানান, প্রাথমিকভাবে লিফটের মেশিন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে হাসপাতালে ভর্তি কোনো রোগী আগুনে পুড়ে বা পদদলিত হয়ে মারা যায়নি।

একাধিক সিঁড়ি থাকলেও তালাবদ্ধ থাকার অভিযোগ

অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালের নতুন ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নতুন ভবনে একাধিক সিঁড়ি থাকলেও চারটি সিঁড়ি নিয়মিত তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। রোগী ও স্বজনদের চলাচলের জন্য একটি সিঁড়িই মূলত ব্যবহার করা হয়। ফলে আগুন লাগার পর আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনদের একটি মাত্র সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত বের হওয়ার চেষ্টা করতে হয়। এতে হুড়োহুড়ি ও পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এর আগে বিষয়টি জানানো হলেও সিঁড়িগুলো সবসময় খোলা রাখার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিদিন ৩০-৩৫ হাজার মানুষের চাপ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শুধু ময়মনসিংহ নয়, বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রতিদিন এখানে হাজার হাজার রোগী ও তাদের স্বজনের সমাগম হয়।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার হাজার রোগী ভর্তি থাকেন এবং চার থেকে পাঁচ হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন। তাদের সঙ্গে গড়ে তিন থেকে চারজন করে স্বজন থাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষ হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে বা রোগীর সঙ্গে যাতায়াত করেন। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য হাসপাতালের লিফট ও জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ও কার্যকর না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে।

১৫ লিফটের অর্ধেকের বেশি প্রায়ই অচল

মমেক হাসপাতাল মূলত চারতলা পুরোনো ভবন ও নয়তলা নতুন ভবন নিয়ে গঠিত। দুই ভবনে মোট ১৫টি লিফট রয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্যাসেঞ্জার লিফট এবং ১৩টি বেড লিফট। এ ছাড়া মেডিকেল কলেজ, ছাত্র-ছাত্রী ও নার্সিং হোস্টেল মিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাসে লিফটের সংখ্যা ২১টি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের হিসাবে হাসপাতালের ১৫টি লিফটের মধ্যে ১২টি সচল এবং তিনটি অচল। তবে সরেজমিনে এর ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচতলায় সরেজমিনে দেখা যায়, পাশাপাশি থাকা পাঁচটি লিফটের মধ্যে চারটিই বন্ধ ছিল। সচল একটি লিফটের সামনে শতাধিক রোগী ও স্বজনকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে ট্রলিতে থাকা মুমূর্ষু রোগী, অক্সিজেনের সিলিন্ডারসহ শিশু এবং হুইলচেয়ারে থাকা রোগীও ছিলেন।

হাসপাতালে আসা এক রোগীর স্বজন আশরাফুল ইসলাম বলেন, একাধিক লিফট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় রোগী ও স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিফটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় ওপরের তলায় রোগী মারা গেলে লাশ নামানোর জন্যও লিফট পাওয়া যায় না। তখন স্বজনদের সিঁড়ি দিয়ে লাশ নামাতে হয়।

লিফট রক্ষণাবেক্ষণে কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ

হাসপাতালের লিফট রক্ষণাবেক্ষণ ও অপারেটর নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ অফিসের আওতাধীন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লিফট রক্ষণাবেক্ষণের কাজ টেন্ডারের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়। ২০০৭ সাল থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফট রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ‘নাঈমা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করে আসছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের ১৫টি লিফট দুই থেকে তিন শিফটে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক অপারেটর থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে পর্যাপ্ত অপারেটর পাওয়া যায় না।

গত বছর লিফটগুলোর জন্য ৩৫ থেকে ৪০ জন অপারেটরের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। সরকারি হিসাবে একজন অপারেটরের জন্য মাসে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকার কথা। সেই হিসাবে বছরে অপারেটরদের বেতন বাবদ বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে সরেজমিনে বিভিন্ন লিফটে এক থেকে দুইজনের বেশি অপারেটর পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অপারেটরদের নামে বরাদ্দ করা অর্থের বড় অংশ আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নাঈমা এন্টারপ্রাইজের এক অপারেটর দাবি করেন, সরকার জনপ্রতি প্রায় ২২ হাজার টাকা বরাদ্দ দিলেও কোম্পানি তাকে মাত্র ৭ হাজার টাকা দেয়।

রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ নিয়েও অভিযোগ

লিফট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ থাকলেও সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। নগরীর একটি লিফট রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সাজ্জাদুল ইসলাম মুকুল অভিযোগ করেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগসাজশ করে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর একচেটিয়াভাবে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লিফট রক্ষণাবেক্ষণের কাজ পেয়ে আসছে। তার অভিযোগ, টেন্ডারে অন্য প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও নানা অজুহাতে তাদের বাদ দেওয়া হয়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে লিফট ও যন্ত্রাংশ কেনার সুযোগ তৈরি করা হয়।

এ বিষয়ে টপলাইন লিফটের প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম দাবি করেন, গত বছর একটি লিফট কেনার জন্য তাদের প্রতিষ্ঠান ৬২ লাখ টাকার দরপত্র দিলেও সেটি বাতিল করে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হয়। পরে একই লিফট ৮৪ লাখ টাকায় নাঈমা এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে কেনা হয় বলে তিনি দাবি করেন।

এআরডি অকেজো, লিফটে আটকে পড়ার অভিযোগ

হাসপাতালের বিভিন্ন লিফটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আধুনিক লিফটে থাকা অটোমেটিক রেসকিউ ডিভাইস (এআরডি) বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফটকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাছের তলায় নিয়ে দরজা খুলতে সহায়তা করে।

অভিযোগ রয়েছে, মমেক হাসপাতালের অনেক লিফটের এআরডি কার্যকর নেই। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে রোগী ও স্বজনরা লিফটের ভেতরে আটকা পড়েন।

সম্প্রতি নতুন ভবনের একটি লিফট প্রায় ২৫ জন যাত্রী নিয়ে মাঝপথে প্রায় ৩০ মিনিট আটকে থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এতে মুমূর্ষু রোগী ও শিশুদের ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

আসমা বেগম নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, তার বাবা হাসপাতালে ভর্তি। গত এক সপ্তাহে তিনি অন্তত তিনবার লিফটে আটকা পড়েছেন। লিফটের ভেতরে ফ্যান ও আলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে নাঈমা এন্টারপ্রাইজের মালিক ইব্রাহিম খানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

তদন্তের দাবি

একদিকে অগ্নিকাণ্ডে ছয়জনের মৃত্যু, অন্যদিকে হাসপাতালের লিফট অচল থাকা, জরুরি সিঁড়ি তালাবদ্ধ রাখা এবং লিফট রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়মের অভিযোগ-সব মিলিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নতুন করে সামনে এসেছে। রোগী ও স্বজনদের দাবি, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শুধু আগুনের সূত্রপাতের কারণ নয়, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা, সিঁড়ি তালাবদ্ধ রাখা, লিফটের নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অপারেটর নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না-সবকিছু তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে লিফট রক্ষণাবেক্ষণের নামে সরকারি অর্থের অপচয় বা আত্মসাতের অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন তারা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন