ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পরই প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেন নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (নাচোল-গোমস্তাপুর-ভোলাহাট) আসন অন্যতম। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সহসম্পাদক আমিনুল ইসলাম। তাকে প্রত্যাখ্যান করে ধানের শীষের নমিনি পরিবর্তনের দাবিতে একাট্টা হচ্ছেন তৃণমূলের একাংশের নেতাকর্মীরা।
আমিনুলের প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষটির নেতৃত্বে আছেন জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম তুহিন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে প্রতিদিন মশাল মিছিল, বিক্ষোভ, রেলপথ অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করছেন নেতাকর্মীরা। নির্বাচনকেন্দ্রিক এমন অন্তর্কোন্দলে উদ্বিগ্ন নেতাকর্মীরা। দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশনার পরও আমিনুল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি বলে অভিযোগ মনোনয়নবঞ্চিতদের। এতে তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
আমিনুলের মনোনয়ন প্রত্যাহারের দাবিতে চলা আন্দোলনে যোগ হয়েছেন জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক মাসউদা আফরোজ হক শুচি, রহনপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র তারিক আহমদ, বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সেন্টু, সাবেক ছাত্রদল নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইমদাদুল হক মাসুদ। তারা সবাই মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও বিএনপি নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে। দলটির বড় সমস্যা দলের নেতাদের মধ্যে অনৈক্য। দলের মনোনয়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র কোন্দল, যা তৃণমূলকে বিভক্ত ও হতাশ করছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আমিনুল ইসলাম। বিএনপি নেতারা ঐক্যবদ্ধ থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনেন। তবে রাতের ভোটের অবৈধ সংসদে গিয়ে দলের পক্ষে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেননি তিনি। দুঃসময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে না থাকার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে জোরালো। এরপর ২০২১ সালে জেলা বিএনপির নতুন কমিটি হলে বাদ পড়েন আমিনুল অনুসারীরা। তখন থেকে আসনটিতে গ্রুপিং সামনে আসে। কার্যত আমিনুলের অনুসারীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। এমনকি শত শত মামলা-হামলা, ঘরছাড়া নেতা-কর্মীদেরও খোঁজ না নেওয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনটিতে অন্তত ১৪ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। পৃথকভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন অব্যাহত রাখেন তারা। সবাই মনোনয়নের জন্য চেষ্টা করলেও বিএনপি সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করে আমিনুলকে। এরপর থেকে বিক্ষোভ শুরু করেন মনোনয়নবঞ্চিতদের অনুসারীরা। তাদের সবার একই দাবি—আমিনুলকে বাদ দিয়ে যে কাউকে মনোনয়ন দিলে মেনে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করবেন তারা।
তিনটি উপজেলার বিএনপি কর্মীরা জানান, বিএনপি তিন ভাগ হওয়ায় তারা অস্বস্তিতে পড়েছেন। এই অস্বস্তির সুযোগ নিয়ে মাঠের অবস্থান পোক্ত করছে জামায়াতে ইসলামী। দলীয় কোন্দল না মিটলে এই আসনটি হারাতে পারে বিএনপি।
নাচোল উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবু তাহের খোকন বলেন, এই আসনের কর্মীরা ক্ষুব্ধ। আমিনুল ইসলাম এমপি হয়ে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন না। বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম তুহিন দলের দুঃসময়ের কাণ্ডারি হিসেবে জনগণের পাশে ছিলেন। তিনি দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মামলার খরচ, বাড়ির বাজার, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় দেওয়া—সবই করেছেন। এমন ব্যক্তিরা মনোনয়নের যোগ্য। আমরা চাই চূড়ান্ত মনোনয়ন তুহিনকে দিয়ে দল মূল্যায়ন করবে।
বিএনপির কয়েকজন কর্মী বলেন, আমিনুলের ইন্ধনে হিন্দুদের জমি দখল, বিল দখল, একাধিক হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে। এত কিছুর পরও তিনি মনোনয়ন পেয়ে একদিনও মাঠে আসেননি।
জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম তুহিন বলেন, দীর্ঘদিন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক উপজেলা বিএনপির সভাপতিসহ দল যখন যেভাবে চেয়েছে, সেভাবেই কাজ করেছি। দলকে সুসংগঠিত করে এগিয়ে নিয়েছি। এক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামত গুরুত্ব পেলে প্রার্থী নির্বাচনে ভুল হতো না। এখনো সময় আছে, প্রার্থী পরিবর্তন করে বঞ্চিত যে কাউকে দিলেই ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত হবে। তা না হলে হাতছাড়া হতে পারে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসন।


চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ব্লকেড, ভোগান্তিতে লাখো মানুষ
মনোনয়নদ্বন্দ্বে বিভক্ত কুমিল্লা বিএনপি