আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভারতের পানি আগ্রাসনে নাব্য সংকট, বন্ধ যমুনার আট নৌপথ

ইমরান হোসাইন রুবেল, সারিয়াকান্দি (বগুড়া)

ভারতের পানি আগ্রাসনে নাব্য সংকট, বন্ধ যমুনার আট নৌপথ
ছবি: যমুনার ধু-ধু বালুচরে হেঁটে চলাছেন একজন কৃষক

ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রভাবে ধুঁকছে বাংলাদেশের নদ-নদী। বগুড়া অংশের যমুনা নদী শুকনো মৌসুম এলেই নাব্য সংকটে পড়ে যায়। অপরদিকে পানির অভাবে যমুনায় জেগে ওঠে অসংখ্য চর। চলতি মৌসুমেও নাব্য সংকটে বন্ধ হওয়ার পথে যমুনার আট নৌপথ। এতে বাড়ছে যাত্রীভোগান্তি।

স্থানীয়রা জানান, চলতি মৌসুমে নাব্য সংকটের কারণে আট নৌঘাট বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া ডুবোচরের কারণে সারিয়াকান্দির পৌর এলাকার কালিতলা থেকে মাদারগঞ্জ আন্তঃজেলা নৌপথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র বলছে, প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের যমুনা নদীর বাংলাদেশ অংশে রয়েছে ২২০ কিলোমিটার। যমুনা নদীতে দিন দিন নাব্য সংকট বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ উজান দেশের বাঁধ নির্মাণ। ভারত ও চীনের অভ্যন্তরে অন্তত ১৪টি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। নদীর গড় গভীরতা প্রায় সাড়ে ৯ মিটার। কিন্তু বর্তমানে এর গভীরতার পরিমাণ কমে প্রয় দুই মিটারে এসেছে। কোথাও আরো কম।

উপজেলার কর্নিবাড়ি ইউনিয়নের শোনপচা চর গ্রামের আয়েন উদ্দিনের বসতবাড়ি বহু আগেই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তিনি জানান, যতটুকু জমি আছে, সেগুলো চাষ করা অনেক কঠিন। শুকনো মৌসুমে তপ্ত বালু, যাতায়াতে কষ্টের সীমা থাকে না। আবার বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে থাকে।

হাটফুলবাড়ির বালুচরা গ্রামের মাঝি আব্দুল মতিন। তার মূল বাড়ি মথুরাপাড়া। নদীভাঙনের কারণে ১৫ বছরে পাঁচবার তাকে স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। কিন্তু মাঝি পেশা তিনি ছাড়তে পারেননি। বছরের কয়েক মাস তাকে বেকার হয়ে থাকতে হয়। শুকনো মৌসুমে নদীতে পানি না থাকায় এমন অবস্থা তাকে মেনে নিতে হচ্ছে।

আব্দুল মতিন বলেন, বর্ষা ছাড়া অন্য সময় কিছু জায়গায় নৌকা নিয়ে যাই। তাও নৌকার তলা নদীর ডুবোচরে বালুতে আটকে যায়। এ বয়সে আর অন্য কোনো পেশায় যেতে পারিনি।

উপজেলার ঘাটগুলোর ইজারাদার ও মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রমত্তা যমুনা নদীতে একসময় জাহাজ চললেও এখন সেখানে ডিঙি নৌকাও চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ধুনট, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলার ১১টি ইউনিয়নের আটটি নৌপথ এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। ১৪১ চর গ্রামের দুই লক্ষাধিক মানুষ যোগাযোগের জন্য অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমাইয়া ফেরদৌস বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুম এলেই নদী শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হয়। নদী ড্রেজিং করা প্রয়োজন। এজন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড সারিয়াকান্দির উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির বলেন, বাঙ্গালী নদীকে খননের আওতায় আনা হয়েছে। তবে যমুনা নদী খননের কোনো প্রকল্প নেই সরকারের কাছে। বিগত সময়ে বিআইডব্লিউটিআই যমুনা নদীর কিছু কিছু অংশে খনন সমীক্ষা চালিয়েছিল। কিন্তু সেটি ফলপ্রসূ হয়নি। কারণ, যমুনা নদীতে প্রতি বছর কয়েক হাজার টন করে বালু জমা হয়। এ জন্য এখানে খনন করা কার্যকরী হয় না।

প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা ভাটির দেশের মানুষ। এখান দিয়ে নদীর পানি গড়িয়ে সাগরে যায়, উজানের দেশগুলোতে ১৩ থেকে ১৪টি বাঁধ নির্মাণ করেছে। তারা পানি ফিল্টারিং করছে। এতে আমাদের এখানে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর বন্যা দেখা দেয়। আর শুকনো মৌসুমে ধু-ধু বালুচর সৃষ্টি হয়। এসবের প্রভাবে আগামীতে আমাদের এই যমুনা নদী এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হবে, যার কিছু কিছু এখন থেকেই দেখা যাচ্ছে। এই মরুকরণ বন্ধে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা ছাড়া উপায় নেই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন