বর্ষা এলেই পদ্মার পানি বাড়ে। ডুবে যায় চর, তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি, ভেসে যায় ফসল। গবাদিপশু নিয়ে নৌকায় আশ্রয় খোঁজে মানুষ। আবার কয়েক মাস পর সেই পদ্মাই শুকিয়ে পরিণত হয় বিশাল বালুচরে। নদীর বুকজুড়ে তখন পানি নয়, দেখা যায় ধু-ধু বালু। সেচের পানি নিয়ে কৃষকের হাহাকার, নৌযান চলাচল বন্ধ, কমে যায় মাছের বিচরণ ও প্রজনন। কোথাও কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নেমে যায় আশঙ্কাজনকভাবে।
পদ্মাপাড়ের মানুষের কাছে এ যেন পানির এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। বর্ষায় পানি অতিরিক্ত, আর খরায় পানিই নেই।
রাজশাহীতে এখন সেই বর্ষার চিত্র। গত শুক্রবার সকাল ৯টায় বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ১৭.২০ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। রাজশাহীতে বিপৎসীমা ১৮.০৫ মিটার। অর্থাৎ, বিপৎসীমার মাত্র ৮৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হলেও এরই মধ্যে দক্ষিণ তীরের চরখিদিরপুর, খানপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিম্নভূমিতে পানি ঢুকে পড়েছে।
চরখিদিরপুরের মিডিল চরে ঘরবাড়ির উঠানে পানি। কোথাও ঘরের ভেতরও ঢুকছে পানি। রান্নার জায়গা নেই, গবাদিপশু রাখার নিরাপদ স্থান নেই, খাবারের সংকটও তৈরি হয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকে সন্তান-সন্ততি ও গবাদিপশু নিয়ে নৌকায় চড়ে শহরের দিকে আসছেন।
একটি নৌকায় ২৫ থেকে ৩০টি পর্যন্ত গরু তোলা হচ্ছে। কারো নৌকায় পাঁচ-সাতটি, কারো আবার ২০ থেকে ৩০টি গরু। সঙ্গে ধান, জাল, জ্বালানি ও সংসারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। কদিনের মধ্যেই চরবাসীর জীবন যেন নদীর সঙ্গে ভাসছে।
চরখিদিরপুরের বাসিন্দা রাকিবের প্রায় ৫০টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘চরে থাকবার কোনো অবস্থা নেই। সব বাড়িঘর ডুইবে গেছে। গরু নিয়ে বইসে আছি। খুব কষ্টের মধ্যে আছি।’
মনোয়ারা বেগমের দুর্ভোগ আরো করুণ। তার বাড়িঘর পানিতে ডুবে গেছে। গবাদিপশু রাখার জায়গা নেই, রান্নার সুযোগও নেই। তিনি বলেন, ‘আমার সব ডুইবে গেছে। শহরে জাগা নাই। গরু-ছাগল রাখবার জাগা নাই। সকাল থেইক্যে এখনো পর্যন্ত খাইনি।’
শুধু রাজশাহী নয়, উজানের ঢলে চাঁপাইনবাবগঞ্জেও পদ্মার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শিবগঞ্জের পাঁকা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হিসাবে কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি। পানিতে ডুবে গেছে ফসলের মাঠ, বসতবাড়িতে ঢুকেছে পানি। সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে নিরাপদ খাবার পানির।
বর্ষায় পানি, খরায় বালু
কিন্তু পদ্মার এই রূপ সারা বছরের নয়। বর্ষা শেষ হলেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। শুষ্ক মৌসুমে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পদ্মার বুকজুড়ে জেগে ওঠে বিশাল বিশাল চর। নদীর মূল প্রবাহ সংকুচিত হয়ে আসে। কোথাও সরু ধারায় পানি চলে, আর দুই পাশে বিস্তীর্ণ বালুচর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ প্রবণতা আরো স্পষ্ট হয়েছে।
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, বর্ষায় পদ্মায় পানি বেড়ে প্লাবন আর শুষ্ক মৌসুমে নদীর বুক শুকিয়ে যাওয়ার এই বৈপরীত্য স্বাভাবিক নদীপ্রবাহের লক্ষণ নয়। উজানে পানি প্রত্যাহার, নদীতে পলি জমে নাব্য কমে যাওয়া এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে পদ্মার চরিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বর্ষায় উজানের অতিরিক্ত পানি দ্রুত নেমে এলেও শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে পারছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য, নৌপথ ও নদীতীরের মানুষের জীবন-জীবিকায়।
পদ্মার পানির এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সঙ্গে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাব নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা ও গবেষণা চলছে। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার নিম্নমুখী প্রবাহে পানি কমে যাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশে পড়ে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কায় গঙ্গার পানি দুদেশের মধ্যে নির্দিষ্ট সূত্রে ভাগ হয়। ৩০ বছরের এই চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরই শেষ হচ্ছে।
নদী আছে, পানি নেই
পদ্মার পানি কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু নদীর বুকে সীমাবদ্ধ নেই। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও আশপাশের বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতে এর প্রভাব পড়ছে। শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য কৃষকদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
রাজশাহীর উত্তরাঞ্চলেও একই ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। পানি কমে গেলে নদীর শাখা-প্রশাখা ও খাল-বিলের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। মাছের আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হয়। সাম্প্রতিক গবেষণা ও মাঠতথ্যে পদ্মার দেশি মাছ ও ইলিশের অস্তিত্বসংকটের কথাও উঠে এসেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একই নদী কীভাবে বর্ষায় এত পানি বহন করে, অথচ কয়েক মাস পরই কেন তার বুক শুকিয়ে যায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফারাক্কাকে দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। উজানের বৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর গতিপথ ও পলি জমা, বৃষ্টির ধরন পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন এবং নদীব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও এর সঙ্গে জড়িত। তবে শুষ্ক মৌসুমে উজানের পানি প্রত্যাহার যে বাংলাদেশের নদীগুলোর প্রবাহে বড় চাপ তৈরি করেছে, সেটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এদিকে বর্ষায় উজান থেকে ঢল নামলে সেই পানি ধারণ করার মতো স্বাভাবিক নদীপ্রবাহ ও জলাভূমি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর আছে-সেটিও প্রশ্নের বিষয়। নদীর তলদেশে পলি জমে ধারণক্ষমতা কমলে তুলনামূলক কম উচ্চতার পানিতেও চর এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।
ফলে পদ্মাপাড়ের মানুষের জীবনে তৈরি হয়েছে এক নির্মম চক্র। বর্ষায় পানি থেকে বাঁচতে ঘর ছাড়তে হয়, আর খরায় পানির জন্য মাঠে নামতে হয়। এক মৌসুমে গবাদিপশু নিয়ে নৌকায় আশ্রয়, অন্য মৌসুমে একই মানুষ পানির জন্য নলকূপ ও সেচযন্ত্রের পেছনে ছুটছে।
রাজশাহীতে প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ নিয়েও তাই নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে তা ব্যবহার করা। তবে পানি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত না করে শুধু ব্যারাজ নির্মাণ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
পদ্মাপাড়ের মানুষের দাবি, বর্ষার পানি যেন দুর্ভোগের কারণ না হয়, আবার খরার সময় সেই নদী যেন মরুভূমিতে পরিণত না হয়। প্রয়োজন এমন একটি আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা, যেখানে উজান থেকে ন্যায্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত হবে, বর্ষার পানি সংরক্ষণ করা হবে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, কৃষি, মৎস্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা পাবে।
নইলে পদ্মার দুই পাড়ের মানুষকে প্রতিবছর একই দৃশ্য দেখতে হবে, বর্ষায় নৌকা আর খরায় বালুচর।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

