তৃতীয় লিঙ্গের কাণ্ড

গুগলে ‘অজ্ঞান করার ওষুধ’ খুঁজে বন্ধুকে হত্যা, লাশ বস্তায় ভরে গুম

গুগলে ‘অজ্ঞান করার ওষুধ’ খুঁজে বন্ধুকে হত্যা, লাশ বস্তায় ভরে গুম
পুলিশের হাতে আটক নাজিম। বামে নিহত নিঝুম। ছবি: আমার দেশ

বন্ধুকে হত্যার আগে মুঠোফোনে গুগলে সার্চ করে অজ্ঞান করার ওষুধের নাম জেনে নিয়েছিলেন নাজিম উদ্দিন। এরপর কোমলপানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক ও বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যবসায়ী বন্ধু ওয়াহেদ হোসেন ওরফে নিঝুমকে (৩৭) হত্যা করেন তিনি ও তার আরেক বন্ধু মো. স্বপন (২৮)।

পরে লাশ বস্তাবন্দি করে ফেলে রাখা হয় একটি দীঘির পাড়ে।

বিজ্ঞাপন

হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাস পর বুধবার এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলার পর কাহালু উপজেলার মদনাই গ্রাম থেকে নাজিম উদ্দিনকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নাজিম মদনাই গ্রামের বাবলু মিয়ার ছেলে। তিনি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আশা-তে বাবুর্চি হিসেবে কাজ করতেন। তার বন্ধু স্বপনও একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঋণের টাকা নিয়ে বিরোধের জেরেই নিঝুমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন নাজিম ও স্বপন।

নিঝুম বগুড়া শহরের সূত্রাপুর এলাকার ফল ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি বাবার সঙ্গে শহরের স্টেশন সড়কে ‘নিঝুম এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ফলের আড়তের ব্যবসা পরিচালনা করতেন।

পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, কিছুদিন আগে নিঝুম তার মা রঞ্জনা বেগমের নামে আশা এনজিও থেকে ব্যবসার জন্য সাত লাখ টাকা ঋণ নেন। এর মধ্যে তিন লাখ টাকা বাবার হাতে দেন ব্যবসার কাজে। বাকি চার লাখ টাকা থেকে বন্ধু স্বপনকে দুই লাখ এবং নাজিম উদ্দিনকে এক লাখ টাকা ধার দেন।

ধারের টাকা ফেরত চাওয়া এবং লেনদেন নিয়ে একপর্যায়ে নিঝুমের সঙ্গে নাজিম ও স্বপনের বিরোধ তৈরি হয়। এই বিরোধ থেকেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।

পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ৭ আগস্ট শুক্রবার নিঝুমকে কৌশলে ডেকে নাজিম তার কর্মস্থল আশা এনজিওর মালগ্রাম কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে নাজিম তার মুঠোফোনে গুগলে সার্চ করে অজ্ঞান করার ওষুধের নাম জানতে চান।

পরে কোমলপানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক ও বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে নিঝুমকে পান করানো হয়। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

এরপর লাশ একটি বস্তায় ভরে মালগ্রাম মধ্যপাড়া দীঘিপাড় এলাকায় নিয়ে গুম করে রাখা হয়। পরদিন ৮ আগস্ট সকালে নাজিম ও স্বপন আশা কার্যালয় থেকে বের হয়ে যান। ওই দিনই তারা স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে গা ঢাকা দেন।

নিঝুম নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় গত ১২ আগস্ট বগুড়া শহরের মালগ্রাম-শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ সড়কের পাশে মালগ্রাম মধ্যপাড়া দীঘিপাড় এলাকা থেকে বস্তাবন্দি অজ্ঞাতনামা একটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে স্বজনেরা লাশটি নিঝুমের বলে শনাক্ত করেন। এর আগে নিঝুম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল।

লাশ উদ্ধারের পরও হত্যাকাণ্ডের কোনো ক্লু পাচ্ছিল না পুলিশ। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত শুরু হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বগুড়া সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শরিফুল ইসলাম বলেন, নিঝুম নিখোঁজ হওয়ার আগে তার মুঠোফোনে কার কার সঙ্গে কথা হয়েছিল, তা জানতে কললিস্ট সংগ্রহ করা হয়।

কললিস্ট বিশ্লেষণ করে নাজিম ও স্বপনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। হত্যাকাণ্ডের আগে তাদের দুজনের সঙ্গেই নিঝুমের কথা হয়েছিল।

এসআই শরিফুল ইসলাম আরও বলেন, হত্যা মামলা দায়েরের পর অভিযান চালিয়ে কাহালুর মদনাই গ্রাম থেকে নাজিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে এবং ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, নাজিমকে বুধবার বিকেলে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। বগুড়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলাম শুনানি শেষে নাজিমের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী বলেন, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের পর স্বজনেরা সেটি নিঝুমের বলে শনাক্ত করেন।

এরপর হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনে পুলিশ কাজ শুরু করে। আজ নিঝুমের ভাই সোহেল হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন