পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর থেকে

তিনবিঘায় বিএসএফের বাড়তি নজরদারি, উদ্বিগ্ন দহগ্রামবাসী

হাসান উল আজিজ, লালমনিরহাট

তিনবিঘায় বিএসএফের বাড়তি নজরদারি, উদ্বিগ্ন দহগ্রামবাসী
ছবি: আমার দেশ

লালমনিরহাট জেলা শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে পাটগ্রাম উপজেলার ইউনিয়ন দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা। প্রায় ২২ হাজার মানুষের বসবাস সেখানে। চারদিকে ভারতের ভূখণ্ড দ্বারা বেষ্টিত এই ইউনিয়নে প্রবেশ করতে হয় বহুল আলোচিত তিনবিঘা করিডর দিয়ে। কিন্তু সম্প্রতি দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলবাসীর যাতায়াতের একমাত্র পথ তিনবিঘা করিডর দিয়ে চলাচলে ভারতীয় বিএসএফের হয়রানি ও কড়াকড়ি বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলে যাতায়াতের সুবিধার্থে এটি বাংলাদেশকে ইজারার মাধ্যমে দেয় ভারত। এই সরু রাস্তা দিয়ে দুই দেশের নাগরিকেরা চলাচল করে।

বিজ্ঞাপন

এছাড়া রাস্তার মাঝখানে দ্বায়িত্ব পালন করেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা।

amar desh

১৯৭৪-এর মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী হস্তান্তরকৃত এই তিনবিঘা করিডরের আয়তন হওয়ার কথা ছিল দৈঘ্যে ১৭৮ মিটার এবং প্রস্থে ৮৫ মিটার। অথচ সাবেক ছিটমহলবাসী ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে মাত্র ৯ ফুট একটি সরু রাস্তা। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগসহ নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে প্রায় ২২ হাজার দহগ্রামবাসীকে।

এ ছাড়া বিএসএফ চেকপোস্ট, সিসি ক্যামেরা, ট্রাফিক পোস্ট, অবজারভেশন টাওয়ার ইত্যাদির সমন্বয়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসীকে যাতায়াত করতে হয় তিনবিঘা করিডরের ওপর দিয়ে। বর্তমান ৯ ফুটের রাস্তায় চার ও ছয় চাকার গাড়ি প্রবেশ করলে সব ধরনের যানবাহনকে অপেক্ষা করতে হয় পানবাড়ী বা দহগ্রাম পোস্টে। গাড়ি ক্রস করার পর অপেক্ষমাণ যানবাহন যাওয়া-আসা শুরু করে।

করিডরের দুই ধারে লাইটপোস্ট ও ফুলের টব লাগানোর ফলে করিডরটি ৯-১০ ফুটে পরিণত হয়েছে । এতে অনেক সময় গাড়ির বাম্পার কিংবা পরিবহনকৃত মালামালের ধাক্কায় ভারতীয় স্থাপনার কোনো ক্ষতি হলে বাংলাদেশিদের নানা রকম হয়রানিসহ গুনতে হয় জরিমানা। সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর থেকে তিনবিঘা করিডর এলাকায় বাড়তি নজরদারির ব্যবস্থা নিয়েছে বিএসএফ। তবে বিজিবির পক্ষ থেকেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানানো হচ্ছে।

১৯৭৪ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তির সব শর্তকে ভারত বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে এখনো তাদের দখলে রেখেছে তিনবিঘা করিডর। এর ফলে উভয় দেশেই তাদের ছিটমহলে যথাক্রমে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ও দক্ষিণ বেরুবাড়ীর যাতায়াত সুবিধা তৈরি হয়।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ চুক্তি অনুসারে সঙ্গে সঙ্গেই দক্ষিণ বেরুবাড়ী ভারতের কাছে হস্তান্তর করে। তবে ভারত তিনবিঘা করিডর বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতের সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন ছিল, যা রাজনৈতিক কারণে আজও সম্ভব হয়নি।

পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের অনেক বিরোধিতার পর ২০১১ সালে ভারত পূর্ণভাবে এটি বাংলাদেশকে দেওয়ার বদলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ইজারা হিসেবে দিয়েছিল এই শর্তে যে, একই সময়ে দক্ষিণ বেরুবাড়ী ভারতের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। পূর্বে করিডরটি দিনের ১২ ঘণ্টা সময়ের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

amar desh - 2026-05-16T125114.097

পরবতীকালে বিগত ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মধ্যকার বাংলাদেশ- ভারত সরকারের একটি চুক্তি অনুযায়ী বর্তমানে করিডোরটি ২৪ ঘণ্টাই উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯ অক্টোবর ২০১১ করিডরটি উন্মুক্ত ঘোষণা করা হলেও এখনো ভারতীয়দের দখলে রয়েছে তিনবিঘা করিডরের গেটি।

দহগ্রাম আঙ্গরপোতা সংগ্রাম কমিটির সম্পাদক রেজানুর রহমান রেজা বলেন, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পর থেকে তিনবিঘায় বিএসএফের নজরদারি অতীতের যে কোনো সমযয়ের চেয়ে বৃদ্ধি করা হয়েছে! এতে উদ্বিগ্ন দহগ্রামের মানুষ!

তিনি আরো বলেন, দহগ্রামের মানুষ তিনবিঘা করিডর দিয়ে বের হলেই তল্লাশি করার নামে পদে পদে বিএসএফের হাতে হতে হয় লাঞ্ছিত। একজন কৃষক একটি গরু লালন-পালন করে সঠিক সময় বিক্রি করতে পারে না। একটা গরু তিনবিঘা দিয়ে পার করলে নানান বিপত্তি দেখা দেয়। ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক গরুর সিরিয়ালের নামে একজন কৃষক ভোগান্তির শিকার হয়। প্রতি বছর বন্যায় দহগ্রাম ইউনিয়নের প্রবেশ করে বন্যার পানি। প্রতি বছর তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে ছোট হয়ে আসছে দহগ্রাম ইউনিয়নটি।

দহগ্রাম ইউনিয়নের বশির উদ্দিন। পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। তিনি বলেন, ভারতীয় কোনো ভিআইপি তিনবিঘা করিডর অতিক্রম করলে দীঘ সময় করিডরের গেট বন্ধ রাখা হয়। আমরা চাই করিডরের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের স্বাধীনতা, যা ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুসারে হবে।

দহগ্রাম ইউনিয়নের ইউপি সদস্য গোলাম রব্বানী বলেন, আমরা চুক্তি অনুসারে করিডরের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা চাই।

amar desh

দহগ্রামের অধিবাসী মরিয়ম আখতার বলেন, বিএসএফে কোনো ভিআইপি এলে আমাদের তিনবিঘা করিডরের গেট তারা বন্ধ করে দেয়, তখন দীর্ঘ সময় গেটের সামনে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়। এইভাবে প্রায় আমাদের দহগ্রামবাসীকে শাসন করে আসছে তারা। আমাদের জীবনের মূল্য তাদের কাছে কিছুই না, পূর্বঘোষিত নোটিশ ছাড়া এইভাবে গেট বন্ধ করার কোনো ইখতিয়ার নেই তাদের।

দহগ্রামে চর সৈয়দপাড়া গ্রামের মজিবর মিয়া বলেন, ‘আমরা মুক্ত হয়েও বঞ্চিত হয়ে আছি। পাটগ্রাম শহরে হাটবাজার করতে গেলে বিজিবি-বিএসএফের তল্লাশি করে, আবার বাড়ি ফেরার পথে একবার তল্লাশি করে। এভাবেই আমরা প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছি। তিনবিঘা করিডর এলাকায় এমন তল্লাশিতে আমরা স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পাচ্ছি না।দহগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দার তুহিন মিয়া বলেন, বিক্রির জন্য প্রতি সপ্তাহে মাত্র ৬০টি গরুর অনুমতি দেয়, বিএসএফ। এ কারণে আমরা নির্ধারিত সময় গরু বিক্রি করতে পারি না। ফলে অনেক দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হয় আমাদের।

সীমান্ত লাগোয়া বাংলাদেশে প্রথম বাড়িটিই ময়নূল হকের। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৫ সপ্তাহের ব্যবধানে লালমনিরহাট সীমান্তে ২ বাংলাদেশি নাগরিককে গুলি করে হত্যা করেছে বিএসএফ। সব শেষ ১৪ মে বৃহস্পতিবার ভোরে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বনচৌকি বিওপির সীমান্তবর্তী এলাকায় খাদেমুল ইসলাম (২৪) নামের এক বাংলাদেশি যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয় । এর আগে ৮ এপ্রিল লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে আলী হোসেন (৩৮) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। তিনি আরো বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর থেকে সীমান্তবর্তী এলাকায় বাড়তি নজরদারি বৃদ্ধি করেছে বিএসএফ।

এদিকে ১৯৭৪ সালে (মুজিব–ইন্দিরা গান্ধী চুক্তি) ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির অন্যতম শত ছিল, দক্ষিণ বেরুবাড়ী ভারতের কাছে হস্তান্তরের বিনিময়ে বাংলাদেশের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের দৈঘ্যে ১৭৮ মিটার এবং প্রস্থে ৮৫ মিটার ভূমি স্থায়ী ইজারাসহ বাংলাদেশের ভুখণ্ডের সঙ্গে একীভূত হবে এবং ওই ভূ-খণ্ডটুকু বাংলাদেশের অধীনে থাকবে।

তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি যথাযথ সম্মান দেখিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সংসদে বিল পাশ করে দুই বর্গমাইলের বেরুবাড়ী ভারতের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু বিনিময়ের শর্তানুযায়ী তিনবিঘা করিডর আজও পায়নি বাংলাদেশ। ফলে এখনো ভারতের দখলে রয়েছে দেশের এই বহুল আলোচিত তিনবিঘা করিডরটি।

উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকার ভারতকে বাৎসরিক এক টাকা খাজনা কর দেওয়ার সম্মতিতে ৯৯ বছরের জন্য তিনবিঘা করিডর লিজ নেয়। ওই বছরের ২৬ জুন খুলে দেওয়া হয় তিনবিঘা করিডর। সম্প্রতি এই কর আড়াই টাকা করা হয়েছে। কিন্তু শুরু থেকে এখনও প্রস্থে মাত্র ৯ ফুট পাকা রাস্তা ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশিরা। শর্ত অনুযায়ী করিডরের ভেতর দু্পক্ষ কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না। কিন্তু বিএসএফ করিডরের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে দুটি চেকপোস্ট নির্মাণ করেছে। করিডরের নিয়ন্ত্রণ বিজিবির হাতে থাকার কথা থাকলেও কোনোভাবেই মানছে না ভারত সরকার।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন